
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঞ্চল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মূলনীতি হলো সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার, সমান সুবিধা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভ নিশ্চিত করা। তবে দীর্ঘকাল ধরে পার্বত্যাঞ্চলে প্রচলিত কর ব্যবস্থা ও বিশেষ সুবিধাগুলোর ধরন স্থানীয়ভাবে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসমতার সৃষ্টি করেছে, যা এখানকার বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্গমতা, অনগ্রসরতা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কথা বিবেচনা করে তখনকার সরকার সেখানে বসবাসরত উপজাতি জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ রাজস্ব ছাড় বা কর মওকুফের বিধান চালু করেছিল। সেই আমলের প্রেক্ষাপট বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পরিবর্তিত। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, যার ফলে যোগাযোগের মাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আর্থসামাজিকভাবে যথেষ্ট স্বাবলম্বী এবং অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে উপজাতি তরুণ-তরুণীরা দেশে-বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সফলভাবে নিয়োজিত আছেন। পাশাপাশি বিসিএসসহ সরকারি ও প্রশাসনিক বহু উচ্চপদে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে, যা তাদের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ দেয়।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে উপজাতি ব্যবসায়ীদের ঠিকাদারি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগত উপার্জনের ক্ষেত্রে আয়কর প্রদান থেকে বিরত থাকার বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। অথচ একই অঞ্চলে তাদের সাথে পাশাপাশি বসবাসকারী প্রায় ৫৪ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়কর ও রাজস্ব প্রদান করতে হচ্ছে। একই ভূখণ্ডে ও একই প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে বসবাস করে কেবল জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে এমন কর বৈষম্য সংবিধানে উল্লিখিত নাগরিক সমতার পরিপন্থী।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বাঙালি জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কৃষি, ক্ষুদ্র বাণিজ্য ও শ্রমভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত থেকে কঠিন জীবনসংগ্রাম পরিচালনা করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর নীতির এই কাঠামোগত পার্থক্যের কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাঙালিদের জন্য কোনো বিশেষ রাজস্ব সুবিধা রাখা হয়নি। ফলে একই এলাকায় বসবাসকারী দু’টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি স্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য না করার নির্দেশনা দেয়। ইতিবাচক পদক্ষেপ বা বিশেষ সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা মূলত সমাজের অনগ্রসর ও অতিদরিদ্র মানুষের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যা ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যৌক্তিক। কিন্তু যখন অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হওয়ার পরও কেবল উপজাতি হওয়ার কারণে কর ছাড় এবং বাঙালি হওয়ার কারণে কর আরোপের নিয়ম চলে, তখন তা রাষ্ট্রীয় নীতির সমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিগত কয়েক দশক ধরে পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও পরিচালনায় উপজাতি প্রতিনিধিত্বের প্রাধান্য দেখা গেছে। জেলা পরিষদ, জেলা পরিষদে ন্যস্তকৃত দফতরগুলোয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ এবং উন্নয়ন বোর্ডের প্রশাসনিক দায়িত্ব উপজাতি নেতৃত্বের হাতে থাকার কারণে সেখানে তাদের স্বার্থ সুরক্ষার সুযোগ প্রসারিত হয়েছে। বিপরীতে, আঞ্চলিক প্রশাসনিক নীতিতে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মৌলিক দাবি ও সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে গেছে।
চাকরির কোটাব্যবস্থা ও স্থানীয় সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টনের প্রশ্নেও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। পাহাড়ের সরকারি দফতর ও বিভিন্ন সংস্থায় উপজাতিদের নিয়োগের হার তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত বেশি হলেও বাঙালি তরুণরা যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি স্থানীয় তরুণদের পেশাগত বিকাশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে সঙ্কুচিত করছে।
পার্বত্যাঞ্চলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সমতার বিধান জরুরি। সমঅধিকার কেবল মুখে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি ও আইনি কাঠামোতে সুস্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হতে হবে। সমতার এই নীতি বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমিত হবে এবং অঞ্চলে একটি সুষম সামাজিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।
দেশের প্রচলিত আইন ও অভিন্ন সংবিধানের মূলনীতির আলোকে পাহাড়ের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি অধিবাসীর অধিকার ও নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম করবে।
লেখক : সাংবাদিক







