
কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ, শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক, ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ, পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক; নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ।
ফররুখ আহমদের এই কবিতা পড়েননি, এমন পাঠক হয়তো বিরল। কিন্তু ‘পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ’ কথাটা পড়লে অনেকের মনে হতে পারে, কবি বুঝি কল্পনার রঙে সমুদ্রের ঢেউকে পাহাড়ের মতো উঁচু করে এঁকেছেন। ঢেউয়ের মাথায় রুপালি চাঁদের মুকুট উঠুক আর না-ই উঠুক, সমুদ্রের বুকে ঢেউ যে সত্যিই পাহাড়সমান হয়ে উঠতে পারে, তা নিছক কবির কল্পনা নয়। কখনো কখনো সাগরের স্বাভাবিক ঢেউয়ের ভিড়েই হঠাৎ মাথা তোলে এমন এক জলপ্রাচীর, যার উচ্চতা আশপাশের ঢেউকে প্রায় বামন করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে সমুদ্রের চেনা চেহারা। আর সেই ঢেউয়ের সামনে পড়লে বিশাল জাহাজও অসহায় হয়ে উঠতে পারে।
সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক ঢেউয়ের নাম ‘রগ ওয়েভ’। বাংলায় একে বলা যায় দানবীয় বা আকস্মিক বিশাল ঢেউ। বহু শতাব্দী ধরে নাবিকদের মুখে মুখে ফিরেছে এমন ঢেউয়ের গল্প। কিন্তু বিজ্ঞানীরা একসময় এসব কাহিনিকে নিছক নাবিকদের গালগল্প বলেই মনে করতেন। ১৯৯৫ সালের নতুন বছরের প্রথম দিন সেই ধারণায় বড়সড় ধাক্কা লাগে। নরওয়ের উপকূল থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে একটি তেলখনন স্থাপনায় আছড়ে পড়ে প্রায় ২৬ মিটার উঁচু ঢেউ। পরে ‘দ্রাউপনার ঢেউ’ নামে পরিচিত এই ঘটনাই বিজ্ঞানীদের বুঝিয়ে দেয়, সমুদ্রের ভয়ংকর সব কাহিনির পেছনে বাস্তবতা রয়েছে।
এরপর বিভিন্ন সমুদ্রে এমন ঢেউয়ের দেখা মিলেছে। এমনকি হ্রদেও এর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। তবে ২০২০ সালের নভেম্বরে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপকূলে যে ঢেউটি ধরা পড়ে, তার বিশেষত্ব শুধু উচ্চতা নয়; আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় তার অস্বাভাবিক আকারও। কয়েক বছর ধরে তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, নথিভুক্ত রগ ওয়েভগুলোর মধ্যে এটিই অনুপাতের বিচারে সবচেয়ে চরম। আর ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা এতটাই কম যে, এমন ঢেউয়ের দেখা মিলতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর লাগতে পারে।
ঘটনাটির কথা বিস্তারিত তুলে ধরেছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স এলার্টের ১২ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রকাশিত সাংবাদিক কার্লি ক্যাসেলার লেখা। প্রকৃতি ও মানবদেহ থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, বিবর্তন এবং বিজ্ঞানের বিচিত্র আবিষ্কারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখেন তিনি। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন ক্যাসেলা। তাঁর লেখায় বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সহজ করে পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা থাকে।
এবারের কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপকূলের কাছে ইউক্লুলেট এলাকায় সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা একটি ছোট যন্ত্র। মেরিনল্যাবস নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমুদ্রের বিপদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য সেখানে অন্য কয়েকটি যন্ত্রের সাথে একটি ভাসমান বয়া বসিয়েছিল। ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর সেই বয়াটিই এমন এক ঢেউয়ের মুখে পড়ে, যা তাকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ দশমিক ৬ মিটার বা ৫৮ ফুট ওপরে তুলে দেয়। চারতলা ভবনের সমান উঁচু সেই জলপ্রাচীরের খবর অজানাই থাকত, যদি না বয়াটি ঢেউয়ের ধাক্কায় ওভাবে চারতলা সমান উচ্চতায় উঠে না যেত।
কিন্তু কীভাবে বোঝা যায়, কোনো ঢেউ সত্যিই এতটা অস্বাভাবিক? বিজ্ঞানীরা সাধারণত আশপাশের ঢেউয়ের দ্বিগুণের বেশি উঁচু ঢেউকে রগ ওয়েভ হিসেবে নাম দেন। ১৯৯৫ সালে নরওয়ের কাছে দেখা দেয়া দ্রাউপনার ঢেউটি ছিল ২৫ দশমিক ৬ মিটার উঁচু। তার আশপাশের ঢেউগুলোর উচ্চতা ছিল মাত্র ১২ মিটার। ইউক্লুলেটের ঢেউটি উচ্চতায় তার চেয়ে ছোট হলেও আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড় ছিল। তাই ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ইয়োহানেস গেমরিখ ২০২২ সালে বলেছিলেন, অনুপাতের বিচারে ইউক্লুলেটের ঢেউটিই সম্ভবত এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে চরম রগ ওয়েভ। উত্তাল সমুদ্রে এমন ঢেউ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ খুব কমই মিলেছে; এতটা অস্বাভাবিক ঢেউ তো আরো বিরল।
ঢেউয়ের এই খামখেয়ালিপনা শুধু গবেষকদের কৌতূহলের বিষয় নয়। মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। সমুদ্রের অনেক দূরে এমন ঢেউ জাহাজ, বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র ও তেলখনন স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে। যথেষ্ট উঁচু হলে উপকূলের মানুষও বিপদে পড়তে পারে। ১৯৭০-এর দশকে নিখোঁজ হওয়া কয়েকটি জাহাজের ডুবে যাওয়ার পেছনে এমন আকস্মিক ঢেউয়ের ভূমিকা ছিল বলে এখন মনে করছেন গবেষকেরা।
এবার বিপদের আগাম সংকেত খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে প্রকাশিত এক গবেষণায় সমুদ্রের বয়া থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্যের সাথে ঢেউয়ের পূর্বাভাসে ব্যবহৃত বৈশ্বিক মডেলের তুলনা করা হয়। দেখা যায়, মডেলগুলো বড় ঢেউয়ের প্রকৃত উচ্চতা নিয়মিতভাবে কম দেখায়। গবেষকেরা আরো লক্ষ করেন, শীতকালে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের কাছে এমন ঢেউ বেশি দেখা যায়। উত্তর আটলান্টিকেও এর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। ইউক্লুলেটের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, যে এলাকাকে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় আরো একটি সম্ভাব্য আগাম সংকেত মিলেছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রগ ওয়েভের আগে ঢেউগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক দ্রুত কমে যায়, তারপর ঢেউ আঘাত হানার ঠিক আগে আবার বেড়ে ওঠে। এই পরিবর্তন কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গবেষকেরা।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়তে পারে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে প্রকাশিত পরীক্ষামূলক গবেষণাও ইঙ্গিত দিয়েছে, এমন দানবীয় ঢেউ আগের ধারণার চেয়ে চার গুণ পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ফলে ইউক্লুলেটের ঢেউয়ের রেকর্ড কত দিন টিকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
ইউক্লুলেট কিংবা দ্রাউপনার ঢেউ কোনোটিই বড় ধরনের ক্ষতি করেনি, কারো প্রাণও নেয়নি। কিন্তু সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক ঢেউ যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা বুঝতে আরেকটি জাহাজডুবির অপেক্ষায় থাকতে চান না বিজ্ঞানীরা। তাঁদের লক্ষ্য, ঢেউয়ের আচরণ আরো ভালোভাবে বুঝে বিপদ আসার আগেই তার আভাস পাওয়া।
ফররুখ আহমদের সিন্দবাদও তো দরিয়ার বুকে এমন দুর্দম ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘মউজের মুখে তাই ভেসে যাই টুকরা খড়ের মত।’ সেই ঢেউয়ের টানেই আবার নতুন সফরের ডাক আসে, ‘নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ!’
ইউক্লুলেটের সেই বয়া যেন সমুদ্রের বুক থেকে বিজ্ঞানীদেরও নতুন সফরের ডাক শুনিয়েছে। ঢেউয়ের রহস্য বুঝে তাকে আগেভাগে চিনতে পারার এই অভিযানে এখনো অনেক পথ বাকি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








