
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আবারো ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতে দেশের মানুষ যেভাবে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, এবারো সেভাবেই এর উপযুক্ত জবাব দেবে। দেশের ভেতর কিংবা বাইরে-যেখান থেকেই ষড়যন্ত্র হোক না কেন, গণতন্ত্রকামী জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করতে হবে।
গতকাল জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত শোভাযাত্রা উদ্বোধনের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘অতীতেও তারা ষড়যন্ত্র করেছে, এখনো করছে। আবারো তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে চায়। দেশে তথাকথিত ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়।’ তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র করে এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালে, ১৯৯০ সালে এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যেভাবে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, এবারো সেভাবে ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করার শপথ নিতে হবে। ৭ নভেম্বরের এই সমাবেশকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।
সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি আমাদের সঙ্গে আছেন?’ এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা করতালি দিয়ে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশের ভেতর থেকে কিংবা বাইরে থেকে-যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কোনো ষড়যন্ত্রই জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
৭ নভেম্বরকে জাতীয় ঐক্যের দিন হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের দিন। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন। এটি বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার দিন।’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তারেক রহমান উপস্থিত জনতাকে নিয়ে স্লোগান দেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, অন্য কোনো দেশ নয়-সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সবার।’ তিনি বলেন, ‘আসুন, আজ থেকেই আমাদের বিপ্লব শুরু করি।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ছাত্রসমাজসহ বাংলাদেশের জনগণ শুধু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারই করেনি, স্বৈরাচারী শক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীদেরও পরাজিত করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যারা পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই শক্তিগুলো আবারও পরাজিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করা, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব সংঘটিত করা এবং ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো এ দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
এর আগে বেলা ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চে উপস্থিত হয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। পরে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে নিয়ে হেঁটে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
শোভাযাত্রাটি বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পৌঁছায়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী সমাপনী বক্তব্য দেন।
এর আগে দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা নয়া পল্টনে জড়ো হতে থাকেন। কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত এলাকায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় জনসমুদ্রের। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিকৃতিসংবলিত প্ল্যাকার্ড। দিবসটি উপলক্ষে অনেক নেতাকর্মীকে রঙিন টুপি ও টি-শার্ট পরতেও দেখা যায়।
৬ কিলোমিটার হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী : ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব র্যালিতে নেতাকর্মীদের সাথে যোগ দিয়ে ছয় কিলোমিটার পথ হাঁটলেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। র্যালিটি কাকরাইল, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের পাশ দিয়ে হেয়ার রোড, মিন্টো রোড, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়। র্যালিতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র নেতারা অংশ নেন।
পুরো পথের দুই ধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানায়। উচু দালানগুলোতে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী হাসোজ্জ্বল মুখে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। তিনি একগতিতে হেটে চলায় পথে অনেক সিনিয়র নেতাকে তার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সামনে ছিল যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। তারাও প্রধানমন্ত্রীর অবিরাম হেটে যাওয়ার গতি দেখে অবাক হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, এভাবে কোনো প্রধানমন্ত্রীর টানা হাটার দৃশ্য বাংলাদেশে নজিরবিহীন। গণতন্ত্র বিনির্মানের অভিযাত্রায় এটা দেশবাসীকে উজ্জীবিত করবে বলে আমি মনে করি। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচিতে গিয়ে মাইলের পর মাইল হেটেছেন। অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, পুরো পথে কোথাও প্রধানমন্ত্রীর হাটার পথে ছন্দপতন ঘটেনি। একটানা হেটে গেছেন। অন্য নেতাদেরও বলেছেন, হাটেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যে থাকা এসব নেতার পথ চলতে মুখচ্ছŸিতে ক্লান্তির ভাব ফুটে উঠে।
বিএনপি দীর্ঘ ২০ বছর পর নির্বিঘেœ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এ দিবসটি নিয়ে অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ঘটনা, এর প্রভার ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিষয়ে অন্ধকারে ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।
বিএনসিসি-ক্যাডেট-স্কাউট সমাবেশ : গতকাল বিএনসিসি-ক্যাডেট-স্কাউটদের সমাবেশে তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের ম্যাগনাকাটা। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আমরা বাংলাদেশী পরিচয় নির্ধারণের জন্য ভিত্তি ভূমিও রচিত করেছিল। সুতরাং, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে। তরুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, একটি জাতির ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, সত্য ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা।
সকাল ৯টা ৪৫মিনিটে আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, রোভার স্কাউট, স্কাউটদের একটি ডিসপ্লে প্রদর্শন উপলক্ষ্যে এই অনুষ্ঠান হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান গ্যালারি থেকে এই মনোমুগন্ধকর ডিসপ্লে দেখেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্রবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, রোভার স্কাউট ও স্কাউটের সদস্যরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মেজবাহউল আজীমসহ তিন বাহিনীর ঊধর্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন দেশের কুটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাবা-মায়ের কবরে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে তিনি রাজধানীর জিয়া উদ্যানে যান। প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে দুই নেতার মাজারে শ্রদ্ধা জানান। তিনি কিছুক্ষণ একা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে তারা ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মুনাজাতে অংশ নেন। মুনাজাতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রূহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। পরে সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








