
কাওসার আজম
সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। কোথাও নির্বাচিত ডিলারের নাম বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করতে এমপির সুপারিশ, কোথাও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। তালিকা পরিবর্তন, ডিলারশিপ বাতিল ও পুনঃতদন্ত চেয়ে কৃষিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন খোদ সরকার দলীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, যোগ্যতা যাচাইয়ে অনিয়ম এবং সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম না থাকা সত্ত্বেও ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, নতুন ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। অন্য দিকে কৃষিমন্ত্রী অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিন মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ডিলারশিপ চুক্তি বাতিল করার বিষয়টিও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনাজপুরে চার ইউনিয়নে পছন্দের প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ
দিনাজপুর সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা পরিবর্তনের সুপারিশ করেছেন দিনাজপুর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। গত ২৯ অক্টোবর কৃষিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ডিও লেটারে আগে নির্বাচিত চারটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে তার সুপারিশ করা চারটি প্রতিষ্ঠানকে ডিলার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
ডিও লেটারে তিনি করেন, দিনাজপুর সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় ২ নম্বর সুন্দরবন ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের মেসার্স সরকার ট্রেডার্স, ৫ নম্বর শশরা ইউনিয়নের অর্জুনপুরের মেসার্স ইশরাত ট্রেডার্স, ৭ নম্বর উথরাইল ইউনিয়নের মুরাদপুরের এসএসজিএম মেহেদী ট্রেডার্স এবং ৮ নম্বর শংকরপুর ইউনিয়নের মেসার্স রুশাদ ট্রেডার্সকে ডিলার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি।
বাতিলের সুপারিশ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইশরাত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেনকে শশরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এবং রুশাদ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো: শফিকুল আলমকে উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপজেলা কমিটির তালিকা উপেক্ষা করে নিয়োগের দাবি
লালমনিরহাটে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়ে কৃষিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন লালমনিরহাট-২ আসনের এমপি মো: রোকন উদ্দিন বাবুল। গত ২৬ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে তিনি কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির পাঠানো তালিকা বাদ দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পদধারী ও দলটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন তিনি।
মদাতী ইউনিয়নে প্রকৃত সার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ধৃতি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বিধান চন্দ্র রায়কে বাদ দিয়ে শাহরিয়ার ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ করেছেন তিনি। একইভাবে কাকিনা ইউনিয়নে এম এম ফার্টিলাইজারের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান আকাশকে বাদ দিয়ে এম জে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাজু মিয়াকে ডিলার নিয়োগ, চলবলা ইউনিয়নে নুরুনাহার ট্রেডার্সের পরিবর্তে ফাইজান ট্রেডার্স এবং দলগ্রাম ইউনিয়নে রবিউল ইসলামের পরিবর্তে ইসলাম ট্রেডার্সকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আপত্তি জানান। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবেদনপত্র এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের অনুরোধ করেন।
চিতলমারীতে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-উৎকোচের অভিযোগ তুলে কৃষিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গত ২ নভেম্বর পাঠানো ওই আবেদনে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা দাবি করেন, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার বিএনপির পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে।
আবেদনে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএও) খাদিজা আক্তার এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সিফাত আল ফারুকের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। ডিলার নির্বাচনের নথিপত্র, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা। আবেদনটিতে স্বাক্ষর করেছেন চিতলমারী উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন।
শেরপুরে হত্যামামলার আসামির ডিলারশিপ বাতিলের দাবি
শেরপুরের শ্রীবরদীতেও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন মো: মোতালেব হোসেন নামে এক ব্যক্তি। গত ১ নভেম্বর কৃষিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো আবেদনে তিনি দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সবুজ হত্যামামলার এজাহারভুক্ত আসামি সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিকের মালিকানাধীন মেসার্স আলম ট্রেডার্সকে ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশকৃত তালিকায় তার নিজের প্রতিষ্ঠান সালমান এন্টারপ্রাইজের নাম ছিল। তিনি আলম ট্রেডার্সের ডিলারশিপ বাতিল করে সালমান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গুদাম অন্যের দখলে, স্বত্বাধিকারীর কর্মস্থল ঢাকা
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বাঙ্গালা ইউনিয়নেও সার ডিলার নিয়োগের যোগ্যতা ও গুদাম যাচাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মেসার্স সিহাব ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো: ইয়া মণ্ডল। গত ১ নভেম্বর কৃষিমন্ত্রীর কাছে দেয়া আবেদনে তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে কীটনাশক ব্যবসা, ২০০৭-০৮ সালে সার বিতরণ এবং ২০০৯ সাল থেকে বিএডিসির বীজ ডিলার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তার দাবি, প্রায় ৮৫০ বর্গফুটের নিজস্ব পাকা গুদামে ৬০ মেট্রিক টনের বেশি সার সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিলার নির্বাচিত হননি।
অন্য দিকে নির্বাচিত ফারহান এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, বৈধ লাইসেন্স ও গুদামের বাস্তব অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা আবার যাচাইয়ের আবেদন করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর নামে দেখানো গুদামটি অন্য ব্যক্তি ফার্নিচারের ব্যবসায় ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও তার স্বামীর কর্মস্থল ঢাকায় হওয়ায় স্থানীয়ভাবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
মোড়েলগঞ্জে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ডিলার
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জেও খাউলিয়া ইউনিয়নে বিশ্বাস ট্রেডার্সের নামে দেয়া ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন জয়নাল আবেদীন নামে এক ব্যবসায়ী। তার দাবি, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে বিভিন্ন সময়ে সার ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। এবারও প্রভাব খাটিয়ে আবুল আহসান বিশ্বাসের নামে ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। অথচ তিনি নিজে জিসান এন্টারপ্রাইজের নামে আবেদন করেছিলেন। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে ডিলারশিপ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। আবেদনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক এ এস এম নাজমুল উদ্দিনসহ বাগেরহাটের কয়েকজন নেতার সুপারিশও রয়েছে।
খাবার হোটেলকে গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ
এ দিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা তালিকা পরিবর্তনের সুপারিশ নয়, সার ডিলার নিয়োগে গুদামের বাস্তব অবস্থা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার রূপবাটি ইউনিয়নে কৃষকদলের সভাপতি আকরাম হোসেনের মালিকানাধীন শিশির এন্টারপ্রাইজের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বাঘাবাড়ি দক্ষিণপাড় বাজার বাসস্ট্যান্ডে তার খাবার হোটেলের বেসিনের সামনে সারের গুদামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে গুদাম দেখানো হয়েছে। সেখানে সার সংরক্ষণের উপযোগী কোনো গুদাম প্রস্তুত নেই।
প্রত্যক্ষর্শীরা জানান, হোটেলের বেসিনের সামনেই গুদামের সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। হোটেলের ম্যানেজার জুবায়ের হোসেন জানিয়েছেন, আপাতত জায়গাটি হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ভবিষ্যতে সারের গুদাম হবে। ডিলার আকরাম হোসেনও স্বীকার করেছেন, লাইসেন্সের আবেদনের সময় হোটেলের ভেতরে গুদামের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। তার বক্তব্য, সার বরাদ্দ পেলে হোটেলটিকে গুদামে রূপান্তর করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেছেন, এ বিষয়ে আগে কোনো অভিযোগ পাননি। বিষয়টি জানার পর তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
অনিয়মে লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি কৃষিমন্ত্রীর
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের মধ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা কৃষক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত ২ নভেম্বর আসন্ন রবি মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালকদের সাথে মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী এ অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, নতুন ডিলারদের লাইসেন্স দেয়ার পাশাপাশি ডিলারশিপের এলাকা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ, কৃষকের সংখ্যা ও ফসলের নিবিড়তা বিবেচনায় নিতে হবে। নিয়ম লঙ্ঘনকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনানুগব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








