
নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় প্রায় ১১ হাজার গাছ বাঁচাতে আন্দোলনে নেমেছিলেন পরিবেশকর্মী, শিক্ষক, লেখক ও নাগরিকরা। বিশিষ্টজনদের প্রতিবাদের মুখে বাতিল হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা। সেই উদ্যানই একসময় দখল, অবৈধ দোকান, অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড, মাদকসেবন ও নিরাপত্তাহীনতার সমস্যায় জর্জরিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পালা। অবশেষে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মাণের পর আবারো জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে রাজধানীর ওসমানী উদ্যান। তবে নতুন স্থাপনা, কংক্রিটের পথ ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের এই উদ্যানে ইতিহাসের পাশাপাশি কতটা জায়গা পেয়েছে সেই চিরচেনা সবুজ?
গত মাসে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয় উদ্যানটি। এর আগে ১৯ অক্টোবর সংস্কারকৃত উদ্যান ও এর ভেতরে স্থাপিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরদিন এটি খুলে দেয়া হয় জনসাধারণের জন্য। এবারের সংস্কার কাজের ফলে উদ্যানের ঐতিহাসিক পরিচয়ে আরেকটি অধ্যায় যোগ হয়েছে।
পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন ওসমানী উদ্যানটি বাংলাদেশ সচিবালয় ও নগর ভবনের মাঝখানে অবস্থিত। আর এখানেই সংযোগ হয়েছে পুরান ঢাকার সাথে নতুন ঢাকার। কয়েক দশক ধরে গুলিস্তানের যানজট, দোকানপাট ও মানুষের ভিড় থেকে নগরবাসীকে স্বস্তির পরিসর দিয়ে এসেছে এই উদ্যানের গাছপালা ও সবুজায়ন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নাম বহনকারী এই উদ্যান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের স্মৃতি ধরে রাখতে ১১ ভাগে বিন্যস্ত ছিল। সবুজের সমারোহের সাথে যুক্ত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ছিল খোলা গাছপালার বিস্তার, দু’টি ছোট লেক, বালুর দ্বীপ, হাঁটার রাস্তা, ভাস্কর্য এবং মিলনায়তনের মতো স্থাপনা।
আর ছিল ঢাকার ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন মোগল আমলের বিশাল কামান ‘বিবি মরিয়ম’। ঢাকার প্রতিরক্ষার সাথে যুক্ত এই কামান একসময় পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আশির দশকে ওসমানী উদ্যানে আসে। বহু বছর ধরে মূল ফটকের কাছে এটিই ছিল দর্শনার্থীদের আকর্ষণের অনুষঙ্গ। কামানটি এখন আর সেখানে নেই। ২০২৪ সালে সংস্কার করা ঐতিহাসিক ঢাকা গেটের পাশে কামানটি স্থানান্তর করা হয়েছে।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ : নতুন ইতিহাসের সংযোজন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক একর জায়গা নিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রায় ৯০ ফুট উচ্চতার জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ৮৩৪ জনের নাম ধাতব পাতে লেজার দিয়ে খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
পুলিশ সদর দফতরের বিপরীতে প্রধান প্রবেশপথ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণে কংক্রিটের নকশায় ইংরেজি ‘২৪’-এর অবয়ব। নতুন দু’টি ফটকের সাথে বদলে গেছে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থাও।
প্রধান ফটক পেরুলেই বাঁয়ে জলাশয়, সামনে ফোয়ারার অংশ। গাছের ফাঁক দিয়ে চলে গেছে বাঁধানো পথ। পানির ধার বরাবর হাঁটা, কোথাও বসে থাকা, কোথাও উঁচু জায়গা থেকে নিচের সবুজ দেখা- নতুন নকশায় চলাচলের একাধিক ধরন রাখা হয়েছে। পুরনো উদ্যানের তুলনায় পথ ও বসার জায়গাগুলো অনেক বেশি পরিকল্পিত।
ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই- বিভিন্ন সময়কে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে নকশায়।
কংক্রিটের পথে নতুন উদ্যান
কর্তৃপক্ষের হিসাবে নতুন ও সংস্কার করা মিলিয়ে উদ্যানে পথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার। দুই স্তরের নকশার একটি অংশে সমতল থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচুতেও চলাচলের পথ রয়েছে।
মাটির বদলে সড়কগুলো এখন কংক্রিটের। মূল ফটক থেকে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে লম্বা কংক্রিটের পথ। জলাশয়ের মধ্যে কয়েকটি গোলাকার কংক্রিটের কাঠামো, মাঝখানে মাটি, তাতে গাছ; চারদিকে পানি। কোথাও গাছের ভেতর দিয়ে হাঁটার সরু অংশ, কোথাও তুলনামূলক প্রশস্ত বাঁধানো চত্বর; হাঁটার পথের সাথে যুক্ত হয়েছে বেঞ্চ ও বিশ্রাম নেয়ার জায়গা।
পুরনো জলাশয় সংস্কার এবং নতুন জলাধার তৈরির কথাও জানিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। সরকারি উদ্বোধনী বিবরণে পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণের উল্লেখ আছে। জলাশয়ের এই আয়োজনের পূর্ণ সৌন্দর্য অবশ্য পানির ওপর নির্ভরশীল।
পার্কের বিভিন্ন স্তর, গাছ ও স্থাপনা একসাথে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গ্রন্থাগার, ব্যায়ামাগার, নগর জাদুঘর, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, দোকান ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। আছে শিশুদের খেলার ব্যবস্থা, ইনডোর গেমসের জন্য আলাদা এলাকা। ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নতুন আলো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জলাশয়ের পাশে চলাচলের সুযোগও যুক্ত হয়েছে।
সবুজের পরিচয় কতটা অটুট?
নতুন স্থাপনার ভিড়েও ওসমানী উদ্যানের মূল পরিচয় গাছ। এখানে রয়েছে আম, জামরুল, কদবেল, তেঁতুল, গাব, মেহগনি, অর্জুন, স্বর্ণচাপা ও সোনালুর মতো গাছ। যদিও গাছ ও এই সবুজের সমারোহ অনেকটাই কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
এখানকার পুরনো গাছগুলোর অনেকগুলো কেটে ফেলা হয়েছে একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য। তবে কিছু রয়ে গেছে। পার্কটির বিশেষত্ব বুঝতে হলে তাই কংক্রিটের নতুন পথ থেকে কিছুক্ষণের জন্য নজর ফেরাতে হয় পুরনো গাছের দিকে।
গাছ বাঁচানোর আন্দোলন থেকে দীর্ঘ সংস্কারযাত্রা
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এই গাছগুলোকে ঘিরেই নাগরিক আন্দোলন হয়েছিল। ওসমানী উদ্যানে আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হলে প্রায় ১১ হাজার গাছ রক্ষার দাবিতে সরব হন পরিবেশকর্মী, শিক্ষক, লেখক ও নাগরিকরা। কবি শামসুর রাহমানসহ বিশিষ্টজনরা প্রতিবাদে যুক্ত হন। আন্দোলনের মুখে সম্মেলন কেন্দ্রের পরিকল্পনা বাদ পড়ে।
২০০৪ সালে নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশবিদ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে উদ্যান রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০৫ সালে নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়। পূর্ব পাশে কৃত্রিম লেক, পুরনো পুকুরের সংস্কার, সীমানার বেড়া, গাছ লাগানো এবং হাঁটার রাস্তা সেই পর্যায়ের কাজের অংশ। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার হাঁটার পথ জনগণের জন্য খুলে দেয়া হয়।
এরপর ২০১৭ সালের শেষদিকে পুনঃউন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার মাধ্যমে উদ্যানটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ উদ্বোধনের সময় প্রায় ১০ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু সেই সময়সীমা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২২ সালে কাজের অগ্রগতি ও চুক্তির শর্ত পালনে ‘কথিত’ সমস্যার কারণে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্সের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পিএফ করপোরেশনকে কাজ দেয়া হয়। এরপরও নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যায়।
৫৮ কোটি থেকে ১৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প
কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। শুরুতে ৫৪ কোটি থেকে ৫৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হলেও তা বেড়ে ৮৬ কোটি থেকে ৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মূল পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৮ কোটি টাকা।
এদিকে, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও দু’টি নতুন ফটক নির্মাণের জন্য নেয়া পৃথক প্রকল্পের ব্যয় ৪৬ কোটি টাকা থেকে সংশোধন করে ৩৯ কোটি টাকা করা হয়। সব মিলিয়ে প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা।
শেষ পর্যন্ত উদ্যানের মূল সার্থকতা কোথায়?
দীর্ঘ ৯ বছর পর ওসমানী উদ্যান আবারো নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত। নতুন স্থাপনা, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ, জলাশয়, হাঁটার পথ, গ্রন্থাগার, ব্যায়ামাগার ও নানা নাগরিক সুবিধা নিয়ে উদ্যানটি নতুন রূপ পেয়েছে। এর ঐতিহাসিক পরিচয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন অধ্যায়।
তবে উদ্যানের প্রকৃত সার্থকতা শুধু স্থাপনা বা স্মৃতিস্তম্ভের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে সবুজের ছায়া, হাঁটাচলা, বিশ্রাম ও নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নগরবাসী এই উদ্যানকে মূল্যবান মনে করেছেন, সেই পরিচয় অটুট রাখাই হবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








