
নিজস্ব প্রতিবেদক
পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের পেছনে অর্থায়ন এবং জনবল সরবরাহের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের রাজনীতি ও শিল্প খাতের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকসহ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিতের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইতোমধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোকে সংশ্লিষ্টদের হিসাবের বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে সংস্থাটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) গতকাল (বৃহস্পতিবার) দেশের সব ব্যাংকে ই-মেইলের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এ তালিকায় রয়েছেন বেক্সিমকো গ্র“পের মালিক সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, এনভয় গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্র“পের মালিক ও সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
এ ছাড়া ফেবিয়ান গ্র“পের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তুসুকা গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্র“পের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্ট্যান্ডার্ড গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মোশাররফ হোসেন এবং গিভেন্সি গ্র“পের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপার নামও রয়েছে বলে জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার সংস্থাটির এক অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বিশেষ কারণে ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান। এ কাজে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ যুক্ত রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই এবং নতুন নাম যুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলে এনবিআরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তালিকাভুক্ত কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা অন্যান্য সংস্থার আবেদনের ভিত্তিতে জব্দ রয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়ার পর তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। ফলে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থার পৃথক তদন্ত ও প্রশাসনিক উদ্যোগও কার্যকর থাকতে পারে।
এ দিকে ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের পেছনে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থের জোগান ও সাংগঠনিক সহায়তার অভিযোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগনে আলিফ মোল্লা, জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী এবং শুভ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শ্রমিক আন্দোলনে কারা অর্থ সরবরাহ করেছে, কিভাবে অর্থের লেনদেন হয়েছে এবং আন্দোলন সংগঠিত করতে কারা জনবল বা অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলো এখনো তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কয়েকজন শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এ বক্তব্য এবং এনবিআরের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে সম্ভাব্য অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অনুসন্ধান নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ, মজুরি ও বকেয়া পাওনা নিয়ে বিরোধ এবং আন্দোলনের পেছনে কোনো সংগঠিত অর্থায়ন থাকলে তার পৃথক তদন্ত— এসব বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
তারা বলছেন, পোশাকশিল্প দেশের রফতানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ খাতে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। অন্য দিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাব স্থগিতের মতো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








