চালের অ্যাফ্লাটক্সিন দূষণ, চিঁড়ায় বিষাক্ত ছত্রাক, খাদ্যে অ্যাফ্লাটক্সিন, অ্যাফ্লাটক্সিন ও লিভার ক্যান্সার, শিশুদের ক্যান্সার ঝুঁকি, চালজাত খাদ্যের নিরাপত্তা, অ্যাফ্লাটক্সিন গবেষণা, বাংলাদেশে খাদ্যদূষণ
। সংগৃহীত

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় চালের পাশাপাশি চিঁড়া ও মুড়ির মতো চালজাত খাবারও রয়েছে। কিন্তু এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত ছত্রাকজাত উপাদান অ্যাফ্লাটক্সিনের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

Advertisement

ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগৃহীত চাল ও চালজাত খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত চালের ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং চিঁড়ার ৫৫ শতাংশে অ্যাফ্লাটক্সিনের উপস্থিতি রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দূষিত চাল নিয়মিত গ্রহণের ফলে শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণায় চাল খাওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অ্যাফ্লাটক্সিনজনিত লিভার ক্যান্সারের গড় সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে শূন্য দশমিক ০৫১টি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ০৮৮টি কেস হিসেবে নিরূপণ করা হয়েছে।

Advertisement

অন্যদিকে দূষিত চাল গ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্কদের এক্সপোজার মার্জিন বা এমওইর গড় মান পাওয়া গেছে ৮ দশমিক ৩৬ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে ৪ দশমিক ৮৯। অথচ এই সূচকে ১০ হাজারকে নিরাপত্তা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মূল্যায়নে, নমুনাগুলোতে পাওয়া এমওইর মান এই সীমার অনেক নিচে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চাল, চিঁড়া ও মুড়িতে অ্যাফ্লাটক্সিনের উপস্থিতি, খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এর প্রবেশ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণাটির শিরোনাম ছিল, ‘অ্যাফ্লাটক্সিন অকারেন্স ইন রিটেইল রাইস অ্যান্ড রাইড ডেরাইভড প্রোডাক্টস ফ্রম বাংলাদেশ : এন ইভালুয়েশান অব ডায়েটারি এক্সপোজার অ্যান্ড রিলেটেড হেলথ রিস্কস’। এই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক টক্সিকোলজি রিপোর্টস  নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তরল ক্রোমাটোগ্রাফি ও ফ্লুরোসেন্স ডিটেকশন পদ্ধতি (এইচপিএলসি-এফএলডি) ব্যবহার করে নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত করেন।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ‘শুধু চাল নয়, চাল থেকে তৈরি চিঁড়াও দূষণের উল্লেখযোগ্য উৎস হতে পারে। দুই পর্যায়ের নমুনা পরীক্ষায় প্রথম পর্যায়ে চালে অ্যাফ্লাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায় ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ নমুনায়, দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৫ শতাংশে। চিঁড়ার ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০ শতাংশ। দুই পর্যায়ের তথ্য একত্র করলে চালে দূষণের হার দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং চিঁড়ায় ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে পরীক্ষিত মুড়ির কোনো নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত হয়নি।

চালের চেয়ে চিঁড়ায় দূষণের হার দ্বিগুণ
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো চালের তুলনায় চিঁড়ায় অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ। চালের ক্ষেত্রে দূষণের হার ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও চিঁড়ার ক্ষেত্রে তা ৫৫ শতাংশ; অর্থাৎ বাজারে বিক্রি হওয়া চিঁড়ার প্রতি ১০টি নমুনার পাঁচটিরও বেশি নমুনায় বিষাক্ত উপাদানটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

পরীক্ষিত চালে মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের মাত্রা ছিল প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৪৭ থেকে ৩ দশমিক ৬৩ মাইক্রোগ্রাম। চিঁড়ায় এই মাত্রা ছিল প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৩৭ থেকে শূন্য দশমিক ৮৭ মাইক্রোগ্রাম। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- চিঁড়ায় দূষিত নমুনার অনুপাত বেশি হলেও প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ দূষণের মাত্রা চালে বেশি পাওয়া গেছে। তাই দূষণের হার এবং দূষণের ঘনত্বকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গবেষণায় মুড়ির কোনো নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন পাওয়া না যাওয়াকে আপাত স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এই ফলাফল দিয়ে দেশের সব ধরনের মুড়ি নিরাপদ-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কারণ গবেষণাটি ঢাকার নির্দিষ্ট বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনার ওপর পরিচালিত। অঞ্চল, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, কাঁচামালের মান, সংরক্ষণব্যবস্থা ও মৌসুমভেদে দূষণের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।

অ্যাফ্লাটক্সিন কী, কেন এত বিপজ্জনক? 
অ্যাফ্লাটক্সিন হলো একধরনের বিষাক্ত গৌণ বিপাকীয় উপাদান, যা নির্দিষ্ট প্রজাতির ছত্রাক থেকে উৎপন্ন হয়। বিশেষ করে এ্যাসপারজিলাস ফ্ল্যভাস এবং এ্যাসপারজিলাস প্যারাসাইটস নামের ছত্রাক এই বিষ তৈরি করে। এছাড়া আরো কয়েকটি প্রজাতির ছত্রাক থেকেও অ্যাফ্লাটক্সিন উৎপন্ন হতে পারে।

অ্যাফ্লাটক্সিনের প্রধান চারটি ধরন হলো- এএফবি১, এএফবি২, এএফজি১১, এএফজি২। এর মধ্যে এএফবি১ সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এটি শক্তিশালী জিনগত পরিবর্তনকারী ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) অ্যাফ্লাটক্সিনকে গ্রুপ-১ মানব ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে; অর্থাৎ মানুষের মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির বিষয়ে এর পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।

দূষিত খাবারের সাথে অ্যাফ্লাটক্সিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এরপর তা রক্তের মাধ্যমে লিভারে পৌঁছায়। সেখানে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে সাইটোক্রোম পি৪৫০ এনজাইমের মাধ্যমে এএফবি১ আরো সক্রিয় বিষাক্ত যৌগে রূপান্তরিত হয়। এই যৌগ ডিএনএর সাথে যুক্ত হয়ে জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে লিভারের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।

শুধু লিভার ক্যান্সার নয়, অ্যাফ্লাটক্সিনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে কিডনির ক্ষতি, প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, পুষ্টিগত সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় জটিলতার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের শরীর এখনো বিকাশমান এবং শরীরের ওজনের তুলনায় খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দূষিত খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে বিষাক্ত উপাদানের আপেক্ষিক প্রবেশমাত্রা বেশি হতে পারে।

শিশুদের ঝুঁকি কেন বেশি
গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের অ্যাফ্লাটক্সিনজনিত লিভার ক্যান্সারের সম্ভাব্য ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে গড় ঝুঁকি শূন্য দশমিক ৫১টি কেস হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে তা শূন্য দশমিক ৮৮টি; অর্থাৎ গবেষণার ব্যবহৃত অনুমান ও মডেল অনুযায়ী শিশুদের ঝুঁকি প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই সংখ্যা কোনো নির্দিষ্ট শিশুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিংবা বর্তমানে দেশে অ্যাফ্লাটক্সিনজনিত ক্যান্সার রোগীর প্রকৃত পরিসংখ্যান নয়। এটি খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার বিবেচনায় গবেষকদের নির্ধারিত জনসংখ্যাভিত্তিক ঝুঁকির হিসাব।

তবে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হওয়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিশু প্রতিদিন ভাত, খিচুড়ি, চিঁড়া ও অন্যান্য চালজাত খাবার গ্রহণ করে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের খাদ্য তালিকায় চালের ওপর নির্ভরতা বেশি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় চিঁড়া-মুড়ির মতো খাদ্য সহজে বহন ও সংরক্ষণ করা যায় বলে ত্রাণ এবং জরুরি খাদ্য হিসেবেও এগুলোর ব্যবহার ব্যাপক।

এ কারণে চাল ও চালজাত খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত।

নিরাপত্তা সূচকে উদ্বেগজনক চিত্র
গবেষণায় অ্যাফ্লাটক্সিন গ্রহণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে দু’টি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। একটি হলো মার্জিন অব এক্সপোজার বা এমওই এবং অন্যটি লিভার ক্যান্সারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ।

এমওই পদ্ধতিতে মানুষের খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা বিষাক্ত উপাদানের পরিমাণকে পরীক্ষামূলক প্রাণীর ওপর পরিচালিত বিষক্রিয়া গবেষণায় পাওয়া নির্দিষ্ট ক্ষতিকর মাত্রার সাথে তুলনা করা হয়। সাধারণভাবে এমওইর মান যত বেশি, সম্ভাব্য উদ্বেগ তত কম। জিনগত ক্ষতি ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের ক্ষেত্রে ১০ হাজার বা তার বেশি এমওইকে তুলনামূলকভাবে কম উদ্বেগের মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু গবেষণায় চাল গ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্কদের এমওইর গড় মান ৮ দশমিক ৩৬ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্র ৪ দশমিক ৮৯ পাওয়া গেছে; অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মানটি ১০ হাজারের তুলনায় অত্যন্ত কম। এটি দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

চিঁড়ার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে। দূষিত চিঁড়া গ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্কদের গড় এমওই পাওয়া গেছে তিন হাজার ৭৭১ দশমিক ৪। এটিও ১০ হাজারের নিচে। তবে চিঁড়ার ক্ষেত্রে গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের সম্ভাব্য লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে শূন্য দশমিক ০০০৩টি কেস।

এখানে গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। চিঁড়ার ঝুঁকি নিরূপণে প্রাপ্তবয়স্কদের তথ্য দেয়া হলেও শিশুদের জন্য একই ধরনের পৃথক ঝুঁকির হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি। তাই শিশুদের চিঁড়া গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সংখ্যাগত সিদ্ধান্ত দেয়া যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যাফ্লাটক্সিনের জন্য কোনো গ্রহণযোগ্য দৈনিক গ্রহণমাত্রা বা টলারেবল ডেইলি ইনটেক নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এটি জিনগত ক্ষতি করতে পারে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে খাদ্যে এর উপস্থিতি যত কম রাখা যায়, জনস্বাস্থ্যের জন্য তত ভালো।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও সংরক্ষণব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ 
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে অ্যাফ্লাটক্সিন উৎপাদনকারী ছত্রাকের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রা, অতিবৃষ্টি, বাতাসে আর্দ্রতা ও খাদ্যশস্যের অনুপযুক্ত সংরক্ষণ ছত্রাকের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

ধান উৎপাদনের মাঠ থেকে শুরু করে কাটা, মাড়াই, শুকানো, পরিবহন, চালকল ও খুচরা বাজার-প্রতিটি পর্যায়েই খাদ্যশস্য ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকতে পারে। বিশেষ করে ধান কাটার পর যথাযথভাবে শুকানো না হলে কিংবা আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হলে ছত্রাক জন্মানোর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে ধান সংগ্রহের পর অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের বাড়ি, স্থানীয় আড়ত, গুদাম ও চালকলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা অতিক্রম করে চাল ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এ সময়ে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, গুদামের বায়ু চলাচল, বস্তা ও মেঝের পরিচ্ছন্নতা এবং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ যথাযথ না হলে দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে গবেষণাটিতে নির্দিষ্টভাবে কোন পর্যায়ে কত শতাংশ দূষণ সৃষ্টি হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হয়নি; অর্থাৎ দূষণের উৎস উৎপাদন ক্ষেত্র, চালকল, পরিবহন নাকি খুচরা সংরক্ষণ-এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার সুযোগ নেই। এজন্য উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ের নমুনা নিয়ে পৃথক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হলে ছত্রাকের বিস্তার এবং খাদ্যশস্যে মাইকোটক্সিন উৎপাদনের ধরনও বদলে যেতে পারে। ফলে শুধু বর্তমান দূষণের চিত্র নয়, ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনাতেও অ্যাফ্লাটক্সিনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের করণীয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ খাদ্যশস্যে অ্যাফ্লাটক্সিনের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করেছে। গবেষণায় উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্যশস্যে এএফবি১-এর সর্বোচ্চ সীমা প্রতি কেজিতে ২ মাইক্রোগ্রাম এবং মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের সীমা ৪ মাইক্রোগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রে চালের ক্ষেত্রে মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের সীমা প্রতি কেজিতে ২০ মাইক্রোগ্রাম। ভারত ও চীনে চালের জন্য যথাক্রমে মোট অ্যাফ্লাটক্সিন ৩০ মাইক্রোগ্রাম এবং এএফবি১ ১০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সীমা নির্ধারণের কথা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় পাওয়া চালের মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬৩ মাইক্রোগ্রাম এবং চিঁড়ায় শূন্য দশমিক ৮৭ মাইক্রোগ্রাম; অর্থাৎ নমুনায় শনাক্ত মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের উল্লিখিত মোট অ্যাফ্লাটক্সিনের ৪ মাইক্রোগ্রাম সীমার নিচে ছিল।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। কোনো নমুনায় দূষণের মাত্রা নির্ধারিত আইনি সীমার নিচে থাকলেই সেটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায় না। বিশেষ করে অ্যাফ্লাটক্সিনের মতো জিনগত ক্ষতি ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি। এ কারণেই গবেষকরা শুধু দূষণের মাত্রা নয়, খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা বিষাক্ত উপাদানের পরিমাণ এবং এমওই ও ক্যান্সার ঝুঁকিও হিসাব করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য এ গবেষণার তাৎপর্য এখানেই। খাদ্যে অ্যাফ্লাটক্সিনের উপস্থিতি নিয়ে আগে বিচ্ছিন্ন তথ্য থাকলেও চাল, চিঁড়া ও মুড়ির দূষণ পরিস্থিতি এবং একই সাথে এমওইভিত্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে এটি দেশের প্রথম সমন্বিত গবেষণা বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।

তবে গবেষণাটিকে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে। ফলে দেশের সব জেলা, গ্রামাঞ্চল, চালকল, গুদাম এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যের প্রতিনিধিত্ব এই নমুনা করে না। গবেষণার ফলাফলকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হলে বড় পরিসরে এবং অঞ্চলভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

যেসব পদক্ষেপ জরুরি
গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। 
প্রথমত, বাজারে বিক্রি হওয়া চাল ও চালজাত পণ্যে অ্যাফ্লাটক্সিন পরীক্ষার জন্য নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে বাজারভিত্তিক নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ধান ও চাল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষক, চালকল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও গুদাম পরিচালকদের আধুনিক শুকানো এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। খাদ্যশস্য যেন ভেজা মেঝে, দেয়াল কিংবা আর্দ্র পরিবেশের সংস্পর্শে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, চাল ও চিঁড়ার মতো পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা চালু করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্য, স্কুলের খাবার, হাসপাতালের খাবার এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণসামগ্রীর ক্ষেত্রে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

চতুর্থত, অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত করার আধুনিক পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সব বাজারজাত পণ্যের পরীক্ষা সম্ভব না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, মৌসুম ও পণ্য চিহ্নিত করে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, ভোক্তাদের মধ্যে খাদ্য সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। চাল ও চিঁড়া শুকনো, পরিষ্কার ও বায়ু চলাচলযোগ্য স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত। ভেজা, ছত্রাকযুক্ত, বিবর্ণ বা অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। তবে মনে রাখতে হবে, অ্যাফ্লাটক্সিন সব সময় দৃশ্যমান ছত্রাক বা গন্ধের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায় না। সাধারণ রান্না বা গরম করলেও এর সবটুকু নষ্ট হয় না। তাই শুধু ধুয়ে বা রান্না করে দূষিত খাদ্যকে নিরাপদ করা যাবে-এমন ধারণা সঠিক নয়।

খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন সতর্কবার্তা 
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আলোচনায় সাধারণত খাদ্যে ভেজাল, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু ও জীবাণুদূষণ বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু অ্যাফ্লাটক্সিনের মতো অদৃশ্য বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নতুন করে সামনে এনেছে এই গবেষণা।

বিশেষ করে দেশের প্রধান খাদ্য চালের প্রায় ২৮ শতাংশ নমুনায় এবং চিঁড়ার ৫৫ শতাংশ নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি বেশি হওয়ার তথ্যও বিষয়টিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এ গবেষণা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অ্যাফ্লাটক্সিনের কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন কিংবা বাজারের সব চাল ও চিঁড়া অনিরাপদ। কিন্তু এটি দেখিয়েছে, নিত্যদিনের খাদ্যপণ্যের একটি অংশে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের সম্ভাব্য ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের উৎপাদন থেকে ভোক্তার খাবারের থালা পর্যন্ত সমন্বিত নজরদারি। কারণ খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা নাগরিকের স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক দায়িত্ব।