
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
তিন মাসেরও বেশি সময় পর দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি দেখা গেল। গতকাল নিয়ে টানা দু’দিন দেশের পুঁজিবাজারের ইতিবাচক আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। আগস্টের শুরু থেকে টানা দরপতনের শিকার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা আক্ষরিক অর্থেই প্রায় সর্বস্বান্ত। এক প্রকার হাল ছেড়ে দিয়ে যখন নিজেদের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন তখন হঠাৎ করেই পাল্টে যায় পুঁজিবাজার আচরণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া দু’টি সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো বাজার চিত্র। আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে পুঁজিবাজার।
গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এর আগে বুধবারই এর সূচনা দেখ্ াযায়। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিলের বিনিয়োগের সময়সীমা আরো একবছর বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পর দিন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এক আদেশে দীর্ঘদিন ধরে অবরূদ্ধ থাকা বড় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবকে শর্তসাপেক্ষে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর্থিক খাতের দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর দ্রুত প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। আর এভাবেই পাল্টে যায় পুঁজিবাজার আচরণ।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৭১ দশমিক ৪০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৩৪১ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪১৩ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩১ দশমিক ০১ ও ১০ দশমিক ৮২ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৪২ দশমিক ০৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৫৬ দশমিক ৬৪ ও ৮৯ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট।
গতকাল মতিঝিল ব্যাংকপাড়ায় অবস্থিত ডিএসইর ব্রোকার হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং ফ্লোরে গিয়ে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের বেশ উৎফুল্ল দেখা যায়। বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে পরিবর্তিত বাজার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে জর্জরিত থাকলেও তা ভুলে তারা বাজার আচরণের এ সুফল তুলে নিতে লেনদেনে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। ব্রোকার হাউস ও ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে কর্মরত ট্রেডাররাও আগে যেখানে অনেকটা অলস সময় পার করতেন সেখানে গতকাল ক্লায়েন্টদের ক্রয়-বিক্রয় আদেশ বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। অকেটা উৎসবমুখর ছিল সে চিত্র।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই বিনিয়োগকারিদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ঢাকা স্টক গতকাল ৬৪৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইতে ১২৩ কোটি টাকা বেশি। বুধবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৫২২ কোটি টাকা। লেনদেন বেড়েছে চট্টগ্রাম বাজারেও। এখানে গতকাল ১৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৫ কোটি টাকা বেশি। বুধবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৪ কোটি টাকা।
এ দিকে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অবরূদ্ধ থাকা ৬১৭টি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব পুনরায় চালু করে লেনদেনের সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজারের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, কমিশনাররা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিবিএ এ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানায়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুরোধ এবং বিএসইসির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৬১৭টি বিও হিসাবের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এসব হিসাবে লেনদেন বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
এ পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে থাকা বিও হিসাবগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় ডিবিএ। সংগঠনটি গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিএসইসির চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেয়। আবেদনে বলা হয়, কোনো আইনগত কর্তৃৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা সরকারি সংস্থার নিষেধাজ্ঞা না থাকলে দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বিও হিসাবগুলো পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। ডিবিএর এ আবেদন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে স্থগিত হিসাবগুলো পুনরায় চালু করে লেনদেনের সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের এমন সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ডিবিএর মতে, বন্ধ বিও হিসাবগুলো পুনরায় সচল করার ফলে দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ শেয়ার আবারো লেনদেনের আওতায় আসবে। এতে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। একই সাথে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বাজারের প্রতি তাদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারেও সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে মার্জিন ঋণ প্রদানকারী স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর জন্য এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংগঠনটি। ডিবিএর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বিও হিসাব স্থগিত থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। হিসাবগুলো পুনরায় চালু হলে আটকে থাকা শেয়ার লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে মার্জিন ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সঙ্কট কাটিয়ে স্বাভাবিক ও সক্রিয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফিরে আসার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
সংগঠনটির মতে, এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর অংশগ্রহণ ও সামগ্রিক গতিশীলতা বাড়বে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








