
- সম্মিলিত পাসের হার ৪৪.০৩%
- কলেজের পাসের হার ৪৪.২৩%
- মাদরাসার পাসের হার ৫২.০১%
- কারিগরির পাসের হার ৩২. ৫৮%
চুয়াডাঙ্গায় জেলায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রকাশিত ফলে এবার ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। জেলার ৪২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া সাত হাজার ৯৩৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছেন চার হাজার ৪৪০ জন। পাস করেছেন মাত্র তিন হাজার ৪৯৩ জন। জেলায় সম্মিলিত পাসের হার ৪৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। সবচেয়ে হতাশাজনক ফলাফল আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজ ও চুয়াডাঙ্গা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। নিগার সিদ্দিক কলেজে পাসের হার ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, আর চুয়াডাঙ্গা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাত্র ৮ শতাংশ।
ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি, পড়াশোনায় অনীহা, শিক্ষক সঙ্কট, কোচিংনির্ভরতা এবং পাঠদানের দুর্বলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা। আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে এবার ২০৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২২ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ১৮৭ জন। পাসের হার ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অথচ কলেজটিতে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নেই। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানে ৩৬ জন শিক্ষক কর্মরত। নিয়মিত ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষ খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়।
কলেজের শিক্ষকদের ভাষ্য, অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না তাকায় পাঠদান ব্যাহত হয়। বিশেষ করে কৃষক পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পারিবারিক ও আর্থিক সঙ্কটে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়াশোনায় সময় দিতে পারছে না। এমনকি ফরম পূরণ করেও প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং বাড়িতে যথাযথ পড়াশোনা না করার কারণে ফলে বিপর্যয় ঘটেছে।
নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক খাইরুল ইসলাম বলেন, ফল বিপর্যয়ের কারণ ছেলেমেয়েরা আগের মতো পড়াশোনা করে না। বইয়ের সাথে তাদের যে সম্পর্ক থাকা দরকার, তা কমে গেছে। শিক্ষার্থীদের আবার পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হবে। কলেজের অধ্যক্ষ আবু নাসির ফল বিপর্যয়ের পিছনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না হওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের শতভাগ ক্লাসে উপস্থিত রাখাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে পাঠদান করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।
অন্য দিকে চুয়াডাঙ্গা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফলাফল আরো হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার ৫০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র চারজন। পাসের হার ৮ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে অটোমোবাইল বিভাগ থেকে দু’জন, ইলেকট্রিক্যাল থেকে একজন এবং ওয়েল্ডিং বিভাগ থেকে একজন উত্তীর্ণ হয়েছেন। অন্য দিকে এগ্রো-মেশিনারি বিভাগে ১১ জন, অটোমোবাইলে আটজন, ইলেকট্রিক্যালে ১৮ জন এবং ওয়েল্ডিং বিভাগে নয়জন অকৃতকার্য হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হয়েছে। দীর্ঘদিন গণিতের শিক্ষক না থাকাকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি শিক্ষক সঙ্কটও প্রকট। মাত্র ১৮ জন শিক্ষক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
চুয়াডাঙ্গা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হালিম মাহমুদ ভূঁইয়া বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকে না। এ কারণে ফলাফলের বিপর্যয় হয়েছে। ইতোমধ্যে গণিত শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনে, সেজন্য শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় এবার ২৪টি কলেজ, ১১টি মাদরাসা ও সাতটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ মোট ৪২টি প্রতিষ্ঠানের সাত হাজার ৯৩৩ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিন হাজার ৪৯৩ জন। এর মধ্যে কলেজ পর্যায়ে সাত হাজার ১৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন তিন হাজার ১৫৬ জন। পাসের হার ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩৯৮ জন আলিম পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২০৭ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ০১ শতাংশ। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১৩০ জন। পাসের হার ৩২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
চুয়াডাঙ্গার শিক্ষাবিদ ও অধ্যক্ষ শাহজাহান বিশ্বাস বলেন, বর্তমান সময়ে কোচিংনির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হচ্ছে না। তারা ক্লাসরুমে ফিরছে না। বিজ্ঞানের ওপরও শিক্ষার্থীদের চর্চা কমে গেছে। শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রেও ত্রুটি রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের যথাযথ মনিটরিং হচ্ছে না।
শিক্ষকদের দায়িত্ব ও পাঠদানের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে তারা আরো পিছিয়ে যাচ্ছে। পাঠদানের পর শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলে ফল বিপর্যয় কমবে। চুয়াডাঙ্গা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, জেলায় এবার প্রথমবারের মতো এমন ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হবে। কেন এমন ফলাফল হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে কাজ চলছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








