
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পাল্টে গেছে পুঁজিবাজার আচরণ। বেশ ক’দিন ধারাবাহিক পতনের পর হঠাৎ সূচকের উন্নতি ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের বড় উন্নতি ঘটে। লেনদেনের শুরু থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সূচকের সাবলীল উন্নতি ঘটে। মাঝখানে একবার মৃদু বিক্রয়চাপ তৈরি হলেও দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠে দুই পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসের পর চলতি সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসে এসে পুঁজিবাজারে সূচকের উন্নতি ঘটল।
সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণের হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক তফসিলি ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ তহবিলের ব্যবহারের সময় বৃদ্ধিকেই দেখছেন। কারণ আগে এই সময়সীমা ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত; কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয়ভাবে তা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর বাজারে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলো। ফলে এসব ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত যে বিক্রয়চাপ তৈরি হতো তা অনেকাংশে কমবে। বাজারে ফের তারল্যপ্রবাহ বাড়বে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৭ দশমিক ৩১ পয়েন্ট বেড়েছে। ৫ হাজার ২৮৪ দশমিক ৩১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৪১ দশমিক ৬২ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৭৬ ও ৬ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৪ হাজার ২১৪ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি ওই দিন বিকেলে লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৩১৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৯৫ দশমিক ৬৫ ও ৬৩ দশমিক ১৫ পয়েন্ট।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেন শুরুর আধঘণ্টার মাথায় প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬৩ পয়েন্ট। ওই সময় সূচকটি অবস্থান করছিল ৫ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৭২ পয়েন্টে। লেনদেনের এ পর্যায়ে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ পরবর্তী এক ঘণ্টায় সূচকটিকে নামিয়ে আনে ৫ হাজার ৩১৭ পয়েন্টে। পরবর্তী সময়ে বিক্রয়চাপ সামলে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচকটি যা লেনদেন শেষ হওয়া অবধি কার্যকর ছিল।
সূচকের বড় উন্নতি সত্ত্বেও গতকাল লেনদেন কমেছে দুই পুঁজিবাজারে। ডিএসই গতকাল ৫২২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৩ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসই’র লেনদেন ছিল ৫৬৫ কোটি টাকা। তবে একই সময় সিএসই’র লেনদেন নেমে আসে তলানিতে। এ দিন চার কোটি টাকা লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় বাজারটি। অথচ মঙ্গলবার সিএসই’র লেনদেন ছিল ১২ কোটি টাকা।
এ দিকে পুঁজিবাজারে বেশ কিছু বড় বিনিয়োগকারীর অবরূদ্ধ বিও হিসাবের আংশিক খুলে দেয়া হচ্ছে। বাজারের স্থবিরতা কাটাতে সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুসারে, এসব বিও হিসাবে শেয়ার কেনাবেচা করা যাবে; কিন্তু পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত কোনো টাকা উত্তোলন করা যাবে না। তবে কোনো অ্যাকাউন্টে মার্জিন থাকলে তা সমন্বয় করা যাবে। বিএসইসি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৎকালীন কমিশন বেশ কিছু বড় বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব অবরুদ্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এসব হিসাবের মাধ্যমে বাজারে কারসাজি করা হয়েছে অথবা অনেক হিসাবে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ রয়েছে এমন সন্দেহ থেকে হিসাবগুলো বন্ধ রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে এসব হিসাব থেকে কেউ টাকা সরিয়ে নিতে না পারে। জানা যায়, এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা ৫০০’র বেশি।
বিপুলসংখ্যক বিও হিসাব অবরূদ্ধ থাকায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। হিসাবগুলোর মাধ্যমে লেনদেন করতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের তহবিল আটকে যায়। লেনদেনে এই তহবিলের অংশগ্রহণের অভাবে বাজারে লেনদেনও কমে যায়। এ অবস্থায় বাজার সংশ্লিষ্টরা অনেক দিন ধরে শর্তসাপেক্ষে এসব বিও অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ধীর গতি, দেশের ভেতরে জ্বালানি-বিদ্যুতের সঙ্কটসহ নানা কারণে পুঁজিবাজারে তীব্র মন্দা দেখা দেয়ায় অবরূদ্ধ অ্যাকাউন্টগুলো খুলে দেয়ার বিষয়টি আবার জোরালোভাবে আলোচনায় উঠে আসে। গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে বাজারে টানা দর পতন হয়েছে। বেশির ভাগ দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে থাকছে। এমন বাস্তবতায় বাজারে তারল্য বাড়িয়ে লেনদেনে গতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে হিসাবগুলো আংশিক চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া এ সিদ্ধান্তই গতকাল বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ হতে পারে।
বিগত কয়েকদিনের মতো গতকালও ডিএসই’র লেনদেনে টেক্সটাইল খাতের সুষ্পষ্ট প্রাধান্য দেখা যায়। ডিএসইতে দিনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের মতিন স্পিনিং মিলস। এ দিন ৩২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩০ লাখ ৫৩ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় ২৪ লাখ ৪৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের এনভয় টেক্সটাইলস ছিল দ্বিতীয় স্থানে। লেনদেনে ডিএসই’র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, সায়হাম টেক্সটাইলস, ফাইন ফুডস, ফার কেমিক্যালস, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








