এলপিজির বাড়তি দামে চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ

 হাবিবুল বাশার 

Advertisement

৯ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। বিশেষ করে শহরের শ্রমজীবী, দিনমজুর, রিকশাচালক ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য রান্নার জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে উঠছে। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবারকে সংসারের অন্যান্য খরচে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অন্য দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।
আরেক দফায় বেড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে দুই হাজার ৬০ টাকা  নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর আগে গত মাসে একই সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। সবমিলিয়ে চলতি বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭১৯ টাকা, যা প্রায় ৫৪ শতাংশ।
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। সংস্থাটির মূল্যতালিকা অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরে আরো ২৫২ টাকা বেড়ে হয় এক হাজার ৮৩৭ টাকা। সর্বশেষ নভেম্বরে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৬০ টাকা। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। গত দেড় মাস ধরে বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে দুই হাজার ৩০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্য দিকে ২০২৫ সালে এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল। ওই বছর দুই দফা দাম বাড়ানোর বিপরীতে কয়েক দফায় কমানো হয়। বছরের সর্বোচ্চ দাম ছিল ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৪৭৮ টাকা। নভেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ২১৫ টাকায়।
রাজধানেীর কেরানীগঞ্জে আল-কারিম গ্যাস হাউজের মালিক ফয়সাল হোসেন তুষার জানান, গ্যাসের দাম বেশি। পাইকারিতে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তবু পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বাজারে আমরা বসুন্ধরা এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। অন্যান্য সাধারণ কোম্পানির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৩০০ টাকায়। বিভিন্ন দোকানগুলোতে একই দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হতে দেখা যায়।
হাজী এন্টারপ্রাইজ দোকানের মালিক অভিযোগ করে বলেন, ডিলারদের কাছেই এখন গ্যাসের দাম বেশি। পাইকারিতে অনেক বেশি দিয়ে নিতে হয়। তিনি বলেন, তার দোকানে বর্তমানে গ্যাসের মজুদ নেই। 
অন্য দিকে গ্যাস সিলিন্ডার ডিলাররা বলছেন, পাইকারিতে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ২৫০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রির কারণ হতে পারে খুচরা ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া। এক দিন গ্যাস সরবরাহ পেলেও পরবর্তী পাঁচ দিন পাওয়া যাচ্ছে না।
ডিলাররা পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাচ্ছেন না উল্লেখ করে ওই ডিলার মালিক বলেন, একটি গ্যাস কোম্পানিকে এক হাজার ২০০ সিলিন্ডারের জন্য টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৮০০টি। সরকার ভোক্তা পর্যায়ে দুই হাজার ৬০ টাকায় গ্যাস পৌঁছে দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু এই দামে তারাও কিনতে বা বিক্রি করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
অতিরিক্ত দামের চাপ পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে থাকেন রিকশাচালক জসিম উদ্দিন। প্রতিদিন তার পরিবারের বাজারে খরচ হয় প্রায় ৬০০ টাকা। সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ হিসাব করলে মাসে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসাভাড়া, পরিবারের অন্যান্য খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও গাড়ির জমাসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে পরিবারকে স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার চিন্তা করছেন তিনি।
হাসনাবাদের একজন সবজি ব্যবসায়ী মোতালেবের ছেলেমেয়েরা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বর্তমানে তারা দু’জন একসাথে থাকেন এবং হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করেন। এতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা খরচ হয়। মোতালেব বলেন, রান্নার ঝামেলা এড়াতে হোটেলে খাচ্ছেন। গ্যাসের দাম দুই হাজার ৩০০ টাকার বেশি হওয়ায় বাইরে খাওয়াকেই সুবিধাজনক মনে করছেন তিনি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে সরকার প্রতিবারই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকির প্রসঙ্গ তুলে ধরে। কিন্তু কাঠামোগত অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ চুক্তির দায় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। সরকার আন্তরিক হলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অগ্রাধিকারের অভাব রয়েছে। জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানোর আগে প্রশাসনিক অপচয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা নিশ্চিত করতে হবে। সব ধরনের অপচয় ও অদক্ষতা দূর করার পর মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বোঝা যাবে, সরকার বিকল্প সব পথ বিবেচনা করেছে।
ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি চাঁদাবাজিও চলছে। চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে ঢাকা শহরে পণ্যমূল্য ৪০ শতাংশ কমে আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না।
জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার সবচেয়ে সহজ পথ বেছে নিচ্ছে- ভোক্তার পকেট থেকে অর্থ নেয়া এবং নিজেদের কাঠামোগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতি আড়াল করা। প্রকৃত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দিতে হলে আগে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে, এরপর জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানোর কথা ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ওপর দুর্ভোগ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি জনগণের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। মূল্যবৃদ্ধির চাপ তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ আগের সরকারের সময় তুলনামূলক ভালো ছিল বলে মন্তব্য করতে শুরু করলে সেটিকে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হওয়া বর্তমান সরকারের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, আওয়ামী লীগের সময় বাজারে যে সিন্ডিকেট ছিল, তার পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সাথে নেতাকর্মীদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রবণতা চলতে থাকলে দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, দেশে একধরনের অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।