প্রকল্প মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ
সড়কের অর্ধেক অংশে চার লেনের কাজ এখনো শুরু হয়নি : নয়া দিগন্ত।

 মালেক আদনান টাঙ্গাইল ও কামাল হোসেন ভূঞাপুর 

Advertisement

ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে সেতু পূর্ব পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার চার লেনের সড়ক উন্নয়ন কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১১১ কোটি টাকা। তবুও কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। ঢিমেতালে কাজে বিভিন্ন সময়ে যানজটে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির ৫২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্প পরিচালকের দাবি- নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৫৫ শতাংশ।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের মার্চে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একবছর বাড়ানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ। সেই সাথে ব্যয় বাড়ানো হয় ১১১ কোটি টাকা। এতে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৭০৪ কোটিতে। কিন্তু মেয়াদ বাড়িয়েও আসেনি তেমন সফলতা। কাজ হয়েছে মাত্র অর্ধেক।
সরেজমিন দেখা গেছে, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পূর্ব পাড়ের গোলচত্বর পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক বিভাজক নেই। দুই লেনে চলাচল করছে যানবাহন। মহাসড়কের এই অংশটুকুতে যাত্রী ও চালকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মহাসড়কের চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন হলেও এলেঙ্গা থেকে সেতুর পূর্ব পাড় পর্যন্ত সড়কটি এখনো আগের অবস্থায়ই রয়ে গেছে। এক পাশের সার্ভিস লেনের কাজ সম্পন্ন হলেও আরেক পাশে পুরনো সড়ক ও সার্ভিস লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। মূল সড়কের দক্ষিণ লেনে এখনো সিসি ঢালাইয়ের কাজ চলছে। কোথাও আবার কাজই শুরু করা হয়নি। এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো কাজ শেষ হয়েছে। 
গত ২ নভেম্বর বিকেলে সড়কের সরাতৈল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৮-১০ জন শ্রমিক ঢালাইয়ের নেট বাঁধার কাজ করছেন। নেট বাঁধা হয়ে গেলে ঢালাই হবে বলে জানান তারা। কথা হয় রফিকুল ইসলাম নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের সাথে। তিনি প্রায় ছয় মাস ধরে এখানে কাজ করছেন। তার মন্তব্য- খুব ধীরগতিতে কাজ হচ্ছে।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী হানিফ পরিবহন বাসের সুপারভাইজার মোহসীন হোসেন বলেন, যে সময়ে এখানে কাজ শুরু হয়েছে, একই সময় সিরাজগঞ্জ কড্ডার মোড় থেকে রংপুরের মডার্নমোড় পর্যন্ত কাজ ধরেছে। ওই কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের কাজ শেষ হয়নি। মনে হয় কেউ কোনো তদারকি করে না। এখানে প্রতি বছর দুই ঈদে যানজটে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সেতুর পূর্ব পাড় গোহালিয়া বাড়ি এলাকার মোস্তাফিজ মির্জাপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বাসে কারখানায় পৌঁছে কাজ করে আবার বাড়ি ফেরেন। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর হলো নির্মাণকাজ চলছে। এত ধীরগতির কাজ কখনো দেখিনি। পুরো রাস্তায় ভালোভাবে এসে বাড়ির কাছে এলেঙ্গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হয়।
যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এই মহাসড়ক দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের প্রায় ২২টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে এই মহাসড়ক দিয়ে। চার লেনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সার্ভিস লেন দিয়ে দুই গাড়ি একসাথে যাতায়াতে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে দরপত্রে অংশ নিয়ে এই মহাসড়ক উন্নয়নের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আব্দুল মোনেম লিমিটেড’।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত আটটি সেতু ও ১০টি কালভার্টের কাজ শেষ হয়েছে। এলেঙ্গা ফ্লাইওভারের পাইলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। পিলারের কাজও শেষের দিকে। আগামী ঈদের আগে এই ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কের মাঝ অংশের কাজ চলমান। ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এক পাশে সাত কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি আন্ডারপাসের কাজ চলমান। এসব আন্ডারপাসের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন কলামের কাজ চলছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আওয়াল বলেন, বালু ও মাটি ঠিকমতো না পাওয়ায় কাজে ধীরগতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫২ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে এই মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে না বলে মনে হচ্ছে। আরো সময় বাড়াতে হবে।
সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, নির্মাণ কাজের ধরণ পরিবর্তন হওয়াসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। কাজের মান সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। এর আগেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য সতর্কতামূলক চিঠি দেয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরেও তারা কাজ শেষ করতে পারবে না। ছয় মাস বৃদ্ধি করতে হবে। তবে আশা করা যায় আগামী বছরের এপ্রিলে নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে।