
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানে হামলা চালানোর ব্যাপারে কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন- এমন দাবি করেছেন মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন। তার দাবি, ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমতি দিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব দাবি করেন কার্লসন। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
তিনি সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মধ্য ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামের একটি স্থানের কথা উল্লেখ করেন। কার্লসনের দাবি, ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ধারণা, ওই স্থানে ইরান আবারো পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। টাকার কার্লসন একজন রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং ফক্স নিউজের সাবেক উপস্থাপক। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘টাকার কার্লসন টুনাইট’ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। বর্তমানে এক্সে নিজের স্বাধীন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন তিনি। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত মন্তব্য করেন। কার্লসনের দাবি, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো প্রায় ৩০০ ফুট পুরু কঠিন গ্রানাইট পাথরে সুরক্ষিত। ফলে প্রচলিত মার্কিন অস্ত্র দিয়ে সেখানে আঘাত করা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক পদক্ষেপের একমাত্র বিকল্প হতে পারে পারমাণবিক হামলা।
কার্লসন তার পোস্টে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বিবি (নেতানিয়াহু) এ বিষয়ে প্রতিদিন ট্রাম্পকে ফোন করেন।’ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন কার্লসন। তার দাবি, ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন নেতানিয়াহুর। তা না হলে তিনি ক্ষমতা হারাতে পারেন এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও কারাদণ্ডের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। কার্লসন আরো অভিযোগ করেন, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবারো শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু। তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফও নেতানিয়াহুর অবস্থান অনুসরণ করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ইসরাইল
এ দিকে ইরানের সাথে নতুন করে সঙ্ঘাত শুরুর আশঙ্কায় তেলআবিবের সামরিক বাহিনী তাদের একাধিক ফ্রন্টে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। গতকাল সোমবার ইসরাইলি গণমাধ্যমের বরাতে রয়া নিউজ এই খবর জানিয়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়ালা জানিয়েছে, তেহরানের সাথে সম্ভাব্য সঙ্ঘাতের আশঙ্কায় ইসরাইল তাদের বিমানবাহিনী, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগকে চরম সতর্কাবস্থায় রেখেছে। বর্ধিত এই সতর্কতার মধ্যে রয়েছে ইসরাইলি বিমানবাহিনী, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রম। খবরে আরো দাবি করা হয়, ইসরাইল ও মার্কিন পেন্টাগন অভূতপূর্ব মাত্রার নিরাপত্তা ও অপারেশনাল সমন্বয়ে পৌঁছেছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে ওয়াশিংটন তেলআবিবকে তা আগে থেকেই জানিয়ে দেবে এমন একটি বোঝাপড়া হয়েছে। এই সম্ভাব্য পূর্ব সতর্কবার্তা ইসরাইলকে সম্ভাব্য ইরানি প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত করার সময় করে দেবে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালুর সম্ভাবনার জন্য ওয়াশিংটন ও তেলআবিব প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ক্রমবর্ধমান ইঙ্গিত পাওয়ার মধ্যেই এই খবর সামনে এলো। জেরুসালেম পোস্ট জানিয়েছে, ট্রাম্প অনুরোধ করলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ইসরাইলি ও আমেরিকান সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, পূর্ববর্তী সপ্তাহে ইসরাইলের নেভাতিম এবং উভদা বিমানঘাঁটিতে দশটির বেশি মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান পৌঁছেছে এবং অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
বাড়ছে উদ্বেগ
সিএনএন জানায়,যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নতুন করে শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্পষ্ট মন্তব্য ও তেহরানের অব্যাহত হুমকি এই অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাত অষ্টম মাসে গড়িয়েছে। ট্রাম্প এক বার্তায় চলতি সপ্তাহে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর কথা বললেও এর পরের পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। রিয়াদের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল-হাসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, তার মধ্য থেকে প্রকৃত বার্তা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্য দিকে যুদ্ধ শুরু হলে তেল স্থাপনার বাইরে এআই খাতসহ অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়া যেকোনো হুমকির জবাব দেয়ার নির্দেশ দেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, পুরস্কার ও শাস্তির কৌশল ইরানের ওপর কাজ করবে না। আমাদের সাতটি শর্ত মেনে নেয়ার পরই কেবল অগ্রগতি সম্ভব। তবে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাক জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ আসতে পারে এবং উভয় পক্ষ একটি সাময়িক বিরতির কাছাকাছি রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আটলান্টায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট যেকোনো সঙ্কট কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পক্ষে, যদি তা সম্ভব হয়। কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও অতীতে আলোচনার সময় হামলার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে পারছে না তেহরান। উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় এই যুদ্ধ বিরতি পায় কি না, তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
শান্তি আলোচনার বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে : ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। গতকাল রোববার দোহায় কাতারের মধ্যস্থতায় টানা তৃতীয় দিনের মতো বৈঠক করেন ইরানি প্রতিনিধিরা। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিজেদের দাবি পূরণ না হলে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো চুক্তি হবে না বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনার বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। গতকাল সোমবার আলজাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়নি, বরং সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোও বাধাগ্রস্ত করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রকৃত আচরণ ও বাস্তব পদক্ষেপ। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। ইরানের দাবিগুলো সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও যৌক্তিক।’
বাকাই আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের বৈধ দাবিগুলো পুরোপুরি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না। একইভাবে হরমুজ প্রণালীও পুনরায় খুলে দেয়া হবে না। কিংবা প্রণালীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে না।’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, দোহায় আলোচনায় হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, সম্ভাব্য চুক্তির পর দুই দিনের মধ্যে প্রণালীটি খুলে দেয়ার একটি প্রস্তাব নিয়ে কাতারের সাথে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্য দিকে ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করুক। তেহরানের মতে, অবরোধ প্রত্যাহার ও অন্যান্য দাবি পূরণ না হলে চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিষয়ে অগ্রগতি সম্ভব নয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








