
দেশের বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির বিপরীতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের দায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে সরকারের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জাভেদ হোসেইনের মতে, রূপপুরের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পুনর্বিন্যাসে সরকারের দর-কষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই সঙ্কট কাটবে না; প্রয়োজন চুক্তির স্বচ্ছ পর্যালোচনা, অযৌক্তিক চার্জ হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় পুনর্নির্ধারণ। নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন নয়া দিগন্তের সিটি এডিটর আশরাফুল ইসলাম। নিচে বিস্তারিত :
প্রশ্ন : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন কী সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে?
জাভেদ হোসেইন : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনতে পারলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলা এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। রূপপুরের গুরুত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়লে মার্কিন ডলারনির্ভর ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় চুক্তি থেকে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বেরিয়ে আসা এবং প্রয়োজনীয় কেন্দ্রগুলোর জন্য অনুকূল শর্ত আদায়ে সরকারের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
তবে শুধু রূপপুর চালু করলেই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কটের সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিগুলোর কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তা না হলে এক দিকে পারমাণবিক বিদ্যুতের সুবিধা নেয়া হবে, অন্য দিকে অলস পড়ে থাকা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
প্রশ্ন : চুক্তি পুনর্বিন্যাসের জন্য কোন সময়টি সবচেয়ে উপযুক্ত?
জাভেদ হোসেইন : চলতি শীতকাল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। শীতকালে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকে।
কিন্তু রূপপুরের কমিশনিং বা বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুতে বিলম্ব হলে সরকার আগামী গ্রীষ্মে আরো জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। এই বিলম্ব ইচ্ছাকৃত না হলেও এর আর্থিক পরিণতি গুরুতর হতে পারে। তাই উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি, গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার সক্ষমতা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরীক্ষার অগ্রগতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি চুক্তি পুনর্বিন্যাসের প্রস্তুতিও এখনই নিতে হবে।
প্রশ্ন : বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কটের ব্যাপ্তি কতটা?
জাভেদ হোসেইন : সরকারের উদ্যোগে প্রস্তুত করা শ্বেতপত্রে ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত বিশেষ বিধান আইনের আওতায় ৪১টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় মোট উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার ৩০৮ মেগাওয়াট।
অন্য দিকে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির হিসাবে, অতিরিক্ত সক্ষমতা-ভিত্তিক চার্জের কারণে বাংলাদেশের বছরে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। এটি কমিটির একটি প্রাক্কলন; বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত অর্থ নয়। তবু এই হিসাব বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এখানে মূল সমস্যা হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হলেও কিছু চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সক্ষমতাভিত্তিক অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে চাহিদা কমে গেলে বা কোনো কেন্দ্র অলস পড়ে থাকলেও আর্থিক দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন : বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে সরকার কিভাবে এগোতে পারে?
জাভেদ হোসেইন : চুক্তিগুলোকে প্রধানত দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করে পর্যালোচনা করা উচিত।
প্রথম শ্রেণীতে থাকবে প্রচলিত ক্রয়বিধি অনুসরণ করে প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে অনুমোদিত প্রকল্প। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও বাজারদরের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে বিদ্যুতের চাহিদা কমে কোনো কেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়লে যথাযথ বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তি পুনর্বিন্যাসের সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
দ্বিতীয় শ্রেণীতে থাকবে ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় দেয়া চুক্তিগুলো, বিশেষ করে যেগুলো প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। এসব চুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ, মূল্য নির্ধারণ, মালিকানার কাঠামো ও ঝুঁকি বণ্টনের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে বিশেষ আইনটি বাতিল হলেও এর আওতায় করা চুক্তির দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়নি। আবার ওই আইনের আওতায় কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল বলেই সেখানে দুর্নীতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। মূল প্রশ্ন হলো, প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে যুক্তিসঙ্গত ব্যয়ে নেয়া হয়েছিল কি না।
প্রশ্ন : চুক্তির স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?
জাভেদ হোসেইন : প্রকৃত চুক্তি, অনুমোদনের নথি ও দরপত্রের শর্তই হবে শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্র প্রতিযোগিতামূলক ছিল বলেই বিদ্যুৎ কেনার মূল চুক্তিটিও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে- এমন দাবি করা যাবে না।
সরকারের উচিত প্রতিটি চুক্তির মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, সক্ষমতা-ভিত্তিক চার্জ, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ও চুক্তি বাতিলের শর্ত আলাদাভাবে পরীক্ষা করা। যেসব চুক্তি বহাল রাখলে জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হয় বলে প্রমাণিত হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নিট সাশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
আর যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে স্থায়ী চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারভিত্তিক মূল্য সমন্বয় এবং অর্থ পরিশোধের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তবে যেকোনো সমঝোতার আগে যাচাই করা বকেয়া, অপরিশোধিত ঋণ, ঋণদাতার সম্মতি, ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যয় হিসাব করতে হবে। জনগণের প্রয়োজন কম খরচের বিদ্যুৎব্যবস্থা- দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সালিশি প্রক্রিয়ার পর আরেকটি বড় বিল নয়।
প্রশ্ন : এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?
জাভেদ হোসেইন : পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশটি মোট ২ হাজার ৪৬৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সমঝোতার মাধ্যমে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
পাকিস্তান সরকারের ঘোষিত হিসাব অনুযায়ী, এসব চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদে মোট ৪১১ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি সাশ্রয়ের কথা ছিল। এটি বার্ষিক সাশ্রয় নয়; চুক্তিগুলোর বাকি পুরো মেয়াদের সম্ভাব্য সাশ্রয়।
এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা আরো ১৪টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংশোধিত চুক্তি অনুমোদন করে। এসব চুক্তি থেকে বছরে ১৩৭ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি সাশ্রয়ের প্রত্যাশা জানানো হয়। দু’টি ঘোষণা পৃথক সময়ের এবং পৃথক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হয়েছিল। তাই যাচাই ছাড়া সেগুলো একত্র করে সাশ্রয়ের হিসাব দেখানো ঠিক হবে না। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করে- চুক্তিকে ‘টেক-অ্যান্ড-পে’ বা বিদ্যুৎ নিলে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা বললেই সক্ষমতাভিত্তিক সব দায় শেষ হয়ে যায় না।
দেশটির নিশাত পাওয়ারের সংশোধিত চুক্তিতে মালিকানাসংশ্লিষ্ট মুনাফার একটি অংশ নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক হিসেবে বহাল রাখা হয়েছিল। উৎপাদনের সাথে যুক্ত অতিরিক্ত পাওনা পাওয়ার শর্তও ছিল। অর্থাৎ এটি ছিল মিশ্র ধরনের সমঝোতা, সক্ষমতা-ভিত্তিক সব অর্থ পরিশোধ পুরোপুরি বাতিল করার উদাহরণ নয়। বাংলাদেশেরও উচিত চুক্তির নামের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি শুল্ক ও চার্জের প্রকৃত কাঠামো ধরে আলোচনা করা।
প্রশ্ন : ডলারের বিনিময় হার বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়কে কিভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে?
জাভেদ হোসেইন : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ডলারনির্ভর মূল্য সমন্বয় বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। ২০২১ সালের জুনের শেষে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। ২০২৫ সালের জুনের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায়। অর্থাৎ ডলারে নির্ধারিত কোনো দায় অপরিবর্তিত থাকলেও শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে টাকায় তার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
এর সাথে চুক্তিতে নির্ধারিত অন্যান্য মূল্য সমন্বয় যুক্ত হলে ব্যয় আরো বাড়তে পারে। অথচ এতে অতিরিক্ত এক ইউনিট বিদ্যুৎও পাওয়া যায় না। তাই চুক্তি পুনর্বিন্যাসের আলোচনায় অযৌক্তিক ডলারনির্ভর মূল্য সমন্বয় বাদ দেয়া বা সীমিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
প্রশ্ন : ডলারভিত্তিক সক্ষমতা চার্জের প্রভাব বোঝাতে কোনো উদাহরণ দেয়া যায়?
জাভেদ হোসেইন : সরবরাহ করা সিএলসি চুক্তির উদাহরণে দেখা যায়, প্রথম থেকে দশম চুক্তিবর্ষ পর্যন্ত সক্ষমতা-ভিত্তিক শুল্কের কয়েকটি উপাদান ডলারে নির্ধারিত, যা পরে টাকায় রূপান্তর করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক একটি উপাদানও রয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ১০৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় অপরিবর্তিত ধরে একটি উদাহরণমূলক হিসাব করা হয়েছে। আগের বিনিময় হার অনুযায়ী বার্ষিক সক্ষমতাভিত্তিক বিল দাঁড়ায় ১২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তী বিনিময় হার অনুযায়ী তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বছরে ব্যয় বাড়ে ৫১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এটি চুক্তির শর্ত ব্যবহার করে তৈরি একটি উদাহরণমূলক হিসাব, সিএলসির প্রকৃত বিলের হিসাব নয়।
বিদেশী মুদ্রায় নির্ধারিত মূল্য সমন্বয়যোগ্য অংশে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবও যুক্ত হতে পারে। ফলে বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাবে ব্যয় বাড়ে। এ কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) উচিত প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থায়ন, ঋণের মুদ্রা ও প্রকৃত ব্যয়ের কাঠামো নিরীক্ষা করা। এরপর স্থানীয় ব্যয়ের অংশগুলো টাকাভিত্তিক করার বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দেশীয় হলেই তার সব অর্থায়ন টাকায় হয়েছে- এমন ধারণা করা যাবে না। একইভাবে, শুধু আজকের বিনিময় হার ধরে মূল্য রূপান্তরের ব্যবস্থা করলেই অতীতে বেড়ে যাওয়া ব্যয় কমবে না। তাৎক্ষণিক সাশ্রয়ের জন্য দর-কষাকষির মাধ্যমে মূল নির্ধারিত অর্থের পরিমাণও কমাতে হবে।
প্রশ্ন : চুক্তির শর্ত প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে?
জাভেদ হোসেইন : চুক্তি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিএলসি চুক্তির ১৩.২(জে) ধারায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পর যোগ্য বিল পরিশোধ না হলে এবং বিলের নির্ধারিত তারিখের পর ১০ কর্মদিবস অতিবাহিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদন স্থগিত রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে ওই স্থগিতাবস্থাতেও সক্ষমতাভিত্তিক অর্থ পরিশোধের বিধান বহাল থাকে।
ধারাটিতে স্থগিতাদেশ কার্যকর করার আগে পৃথক নোটিশ দেয়ার কোনো সুস্পষ্ট পূর্বশর্ত নেই। একই সাথে বিলম্বিতভাবে চুক্তির শর্ত প্রয়োগ করলেই অধিকার পরিত্যক্ত হয়েছে বলে ধরে নেয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।
তাই দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিরোধ সৃষ্টি এবং সালিশি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে। এর পরিবর্তে বিপিডিবির উচিত প্রতিটি বিল, বিরোধপূর্ণ পাওনা, পরিশোধের রেকর্ড, পরীক্ষিত উৎপাদনক্ষমতা এবং পরিচালনসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা। যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই চুক্তি পুনর্বিন্যাসের আলোচনা করতে হবে।
প্রশ্ন : সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি কি একই পদ্ধতিতে পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব?
জাভেদ হোসেইন : না। চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা, অর্থায়নের ধরন এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আলাদা কৌশল নিতে হবে।
মেয়াদ শেষের কাছাকাছি থাকা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তি নবায়ন না করা অথবা শুধু উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে সীমিত মেয়াদে চুক্তি বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।
মধ্যম মেয়াদের চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থের ছাড় দিয়ে আগাম চুক্তি নিষ্পত্তি অথবা স্থায়ী চার্জ কমানোর মাধ্যমে সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে অর্থায়নের কাঠামো, বিদ্যুতের মূল্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অর্থ পরিশোধের শর্ত সতর্কতার সাথে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
মূল চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সিএলসির চুক্তির মেয়াদ ২০৩২ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে এবং সামিট গাজীপুর-২-এর মেয়াদ ২০৩৩ সালের মে মাসের দিকে শেষ হওয়ার কথা। তবে সংশোধনী ও বর্তমানে কার্যকর চুক্তিগত অবস্থান যাচাই করে সময়সীমা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ালেই কি বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমে যাবে?
জাভেদ হোসেইন : শুধু উৎপাদন বাড়ালেই ব্যয় কমবে না। কমসংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বেশি সময় চালিয়ে উৎপাদন বাড়ালে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমাতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রগুলোর অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকলে সেই সুফল সীমিত থাকবে।
একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দু’টি কেন্দ্রের পরিবর্তে একটি কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা হলেও উভয় কেন্দ্রের চুক্তি বহাল থাকলে সম্মিলিত সক্ষমতাভিত্তিক বিল কমবে না। আবার শুধু নির্দিষ্ট চার্জের বোঝা বেশি ইউনিটের মধ্যে ভাগ করে দেখানোর জন্য ভারী জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হলে মোট ব্যয় উল্টো বেড়ে যেতে পারে।
সরকারকে তাই উৎপাদন ব্যয়, সক্ষমতা চার্জ, জ্বালানি ব্যয়, সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুতের চাহিদা একসাথে বিবেচনা করতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বনি¤œ মোট ব্যয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন : রূপপুরের বিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে সরকার কিভাবে বাস্তবিক অর্থে সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে?
জাভেদ হোসেইন : প্রথমত. রূপপুরের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত. কোন সময়ে কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে এবং কোন কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করলে মোট ব্যয় কম হবে, তার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। তৃতীয়ত. বিদ্যুৎ কেনার সব চুক্তির আর্থিক দায় ও ঝুঁকি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে।
চতুর্থত. যেসব চুক্তিতে অযৌক্তিক ব্যয় বা জনস্বার্থবিরোধী শর্ত পাওয়া যাবে, সেগুলো আইনসম্মত ও বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। পঞ্চমত. প্রতিটি সমঝোতার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, ঋণদাতার দাবি, বিকল্প বিদ্যুতের ব্যয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ঝুঁকিও হিসাব করতে হবে।
সবশেষে, অর্জিত সাশ্রয় যেন বিদ্যুতের মূল্য, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ কমাতে কাজে লাগে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। রূপপুর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগকে স্থায়ী আর্থিক সুফলে রূপান্তর করতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চুক্তির কাঠামোতেও সংস্কার আনতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








