
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান গত শনিবার সন্ধ্যায় এক ভিডিও বার্তায় প্রকাশ্যে ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষায় চরম বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেছেন। একইদিন ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জবাবে রাশেদ খান এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান। তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।
গতকাল এক বিবৃতিতে ডিইউজের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর মতো দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য ভিডিও করে প্রচার করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি আক্রমনের শামিল। এই আচরণের মাধ্যমে তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিকেই অস্বীকার করেছেন।
তারা বলেন, আমার দেশ বা অন্য কোনো সংবাদপত্রের খবরে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিবাদ পাঠাতে পারতেন, প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারতেন, এমনকি আইনের আশ্রয়ও নিতে পারতেন। কিন্তু এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ফেসবুকে ভিডিও প্রচার করে সংবাদপত্র সম্পর্কে রাশেদ খান কী বার্তা দিলেন? সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে এভাবে পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা স্পষ্ট উস্কানিমূলক আচরণ। সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে কেউ এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেনা। কারণ ব্যক্তি রাশেদ খান আর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী এক কথা নয়। এ বিষয়টি বুঝতে অপারগ ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল পদে বসা উচিৎ নয়।
নেতারা বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ও আমজনতা দলের সদস্যসচিব তারেক রহমান ‘আমার দেশ’-এর একটি পুরোনো খবরকে কেন্দ্র করে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আইনের আওতায় আনার যে দাবি জানিয়েছেন, তা শুধু উস্কানিমূলকই নয়, বরং সম্পাদককে সরাসরি হুমকি প্রদানের শামিল।
ডিইউজে নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা, আগুন দেয়া এবং পত্রিকা অফিসে হামলার মতো ঘটনা ঘটিয়েছিল। রাশেদ খানের মতো ব্যক্তিরা একই ধরনের অনাকাঙ্খিত উষ্কানি দিয়ে যাচ্ছেন।
ডিইউজে নেতারা এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংবাদপত্রের ওপর আক্রমণ, সম্পাদকদের হুমকি এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে দেশে মূলত গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই সঙ্কুচিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজ এ ধরনের কোনো অপচেষ্টা বরদাশত করবে না।
ডিআরইউর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ : প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের প্রকাশ্যে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)।
গতকাল কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সাথে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
বিবৃতিতে ডিআরইউ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলা শুধু একটি পত্রিকার প্রতি অবজ্ঞা নয়, বরং মুক্ত সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি চরম অবমাননা। কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদনে ভুল থাকলে কিংবা কোনো বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ জানানোর এবং আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলে ক্ষোভ প্রকাশ করা বা প্রতিবাদ করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না। মতের অমিলের জবাব হতে হবে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে, সংবাদপত্র ছিঁড়ে নয়।
তারা বলেন, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। সেই দর্পণে প্রতিফলিত কোনো বিষয় অপছন্দ হলেই দর্পণ ভেঙে ফেলার মানসিকতা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে, কিন্তু সেই সমালোচনার নামে সংবাদপত্রের প্রতি অবমাননাকর আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে সঙ্কুচিত করার আশঙ্কা তৈরি করে।
ডিআরইউ নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল, সংযত ও গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশিত। তার এমন কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক পদ বা ক্ষমতার অবস্থান কাউকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের অধিকার দেয় না। বরং দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের আচরণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতার প্রতিফলন থাকা জরুরি।
তারা আরো বলেন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসীসহ বিভিন্ন মতের সাংবাদিক কাজ করেন। তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা পেশাগত অবস্থান যা-ই হোক, সাংবাদিক হিসেবে তাদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখতে হবে। কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার প্রতিবাদ জানানোই গণতান্ত্রিক পথ। সংবাদপত্রের প্রতি অবমাননাকর আচরণ দিয়ে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না।
বিবৃতিতে নেতারা, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। একই সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা এবং অবাধ মতপ্রকাশের অধিকার সমুন্নত রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলা যায়, কিন্তু সত্য প্রকাশের আকাক্সক্ষাকে ছিঁড়ে ফেলা যায় না। গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে মোকাবেলা করতে হয় যুক্তি দিয়ে, অবজ্ঞা দিয়ে নয়।
রাশেদ খানকে অপসারণের দাবি এনআরসির
প্রকাশ্যে সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খানকে পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ (এনআরসি)। একই সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের জন্য গণমাধ্যমের সাথে আচরণসংক্রান্ত বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
গতকাল রোববার জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান। সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে খোমেনী ইহসান বলেন, কোনো সংবাদপত্রের প্রকাশিত সংবাদ, সম্পাদকীয় অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মতপার্থক্য থাকলে প্রতিবাদের জন্য আইনসম্মত ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি রয়েছে। তার ভাষায়, এ ধরনের আচরণ ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
এনআরসির বিবৃতিতে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত বাক্-স্বাধীনতা ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। দলটির মতে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এসব সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তির এমন প্রকাশ্য আচরণ সরকারের গণমাধ্যমনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও দায়িত্ব এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছে এনআরসি।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিন দফা দাবি জানিয়েছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ। দাবিগুলো হলো- রাশেদ খানকে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) পদ থেকে অপসারণ; গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতি অবমাননাকর আচরণ সরকারের নীতি নয়- এ মর্মে প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ঘোষণা; এবং রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের জন্য গণমাধ্যমের সাথে আচরণসংক্রান্ত বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রণয়ন ও কার্যকর করা।
বিএজের নিন্দা
‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা এবং পত্রিকাটির সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে)।
এক যৌথ বিবৃতিতে বিএজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক আহমদ মতিউর রহমান তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে বিএজে নেতারা বলেন, প্রকাশ্যে ভিডিওতে একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলা কেবল একটি পত্রিকার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নয়; বরং তা মুক্ত সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাতের শামিল। কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদনে ভুল থাকলে কিংবা কোনো বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে প্রতিবাদ জানানোর, প্রেস কাউন্সিলে যাওয়ার অথবা আইনি প্রতিকার চাওয়ার সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথ খোলা রয়েছে; কিন্তু সেসব পদক্ষেপ না নিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্রকাশ্যে সংবাদপত্র ছিঁড়ে হুমকি ছড়ানো কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। মতের অমিলের জবাব দিতে হবে যুক্তি ও সত্য দিয়ে, সংবাদপত্র ছিঁড়ে নয়।
বিবৃতিতে বিএজে নেতারা অবিলম্বে এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








