যত বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় তত খরা
  •  যন্ত্র আছে, নেই দক্ষ জনবল
  •  অবকাঠামোর অভাবে পিছিয়ে গবেষণার সুযোগ
  •  উন্নত গবেষণার অভিজ্ঞতা ছাড়াই শেষ হচ্ছে উচ্চশিক্ষা



দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হু-হু করে বাড়লেও কাক্সিক্ষত সুযোগ ও গবেষণাগারের অভাবে থমকে গেছে উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি- গবেষণা। ইউজিসির বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও নামমাত্র অর্থে আধুনিক ল্যাব, দক্ষ জনবল আর মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে ডিগ্রি মিললেও উন্নত গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়াই উচ্চশিক্ষা শেষ করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে গবেষণার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা সম্পন্ন করতেও অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে গবেষণার সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা নয়। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাও এর প্রধান দায়িত্ব; কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোয় উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় বরাদ্দ বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় কম
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বাজেট ও বার্ষিক প্রতিবেদনেও গবেষণায় বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ একই অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট বাজেট ছিল প্রায় ১১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা।
এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ ছিল ১৭৪ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে ৫৫টি হলেও গবেষণার বরাদ্দ বেড়েছিল তুলনামূলকভাবে সামান্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছে ইউজিসি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২০০ কোটি এবং কমিশনের নিজস্ব গবেষণা খাতে ২৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় এ অর্থ কতটা যথেষ্ট, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই গবেষণার মান বাড়বে না। বরাদ্দের অর্থ কিভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার ফল কী এবং গবেষণার কাজে কতটা অগ্রগতি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত ১৫  বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার জন্য কত টাকা পেয়েছে, কিভাবে ব্যয় করেছে এবং সেই অর্থে কী ফল পাওয়া গেছে, তার সমন্বিত তথ্যও ইউজিসির কাছে নেই।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, অতীতে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত টাকা পেয়েছে, তাদের প্রয়োজন কতটা ছিল এবং বরাদ্দের অর্থে কী ফল এসেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কমিশনের কাছে নেই। এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে একটি গবেষণা তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কেনা কিছু গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতি বর্তমানে সচল নেই। তাই নতুন করে অর্থ বরাদ্দের আগে পুরনো বিনিয়োগের কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ   খানও গবেষণার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার সামর্থ্য ও সম্পদ সীমিত। বিশেষায়িত অনেক বিষয়ে আধুনিক গবেষণাগার প্রয়োজন হলেও সব ক্ষেত্রে তা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণাগার তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
গবেষণাগার নেই, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাজ
গবেষণার অবকাঠামোর অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে। রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ফার্মেসি, মাইক্রোবায়োলজি, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া মানসম্মত গবেষণা কঠিন। অনেকসময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজ থেমে থাকে। আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগার ব্যবহার করতে হলে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় করতে হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান না। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, যন্ত্রপাতি ও অর্থের অভাবে তাদের কাজ সীমিত হয়ে যায়। ফলে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান ও বাস্তব গবেষণার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও অবকাঠামোগত বৈষম্য রয়েছে। ইউজিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৪টি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে শুধু নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিশ্চিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ, পাঠদানের পদ্ধতি, অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা।
গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়লেই গবেষণার মান বাড়ে না। গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অন্য গবেষকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, পেটেন্ট, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সমাজ ও শিল্পে গবেষণার প্রয়োগও বিবেচনায় নিতে হয়।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা দুর্বল হওয়ার পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, গবেষণার মানসিকতার অভাব। দ্বিতীয়ত, গবেষণার ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাগ্রহ। তৃতীয়ত, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা একসাথে মোকাবেলা করতে না পারলে গবেষণার অগ্রগতি সম্ভব নয়।
শিক্ষকদের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকলে মানসম্মত গবেষণা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষককে নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায় না। আবার গবেষণার ফল প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অর্থের সঙ্কট দেখা দেয়।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ দুর্বল
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে দুর্বল যোগাযোগ। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সরাসরি শিল্প ও উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হয়। নতুন প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা তৈরিতে গবেষকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেন। এতে গবেষণার ফল বাস্তব কাজে লাগে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণার জন্য অর্থ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন কার্যকর সম্পর্ক এখনো সীমিত। ফলে অনেক গবেষণা প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা না হওয়ায় উদ্ভাবনের ফলও অর্থনীতিতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায় না।
অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান এ বিষয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের কাজে লাগিয়ে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাঠ্যক্রম তৈরির কমিটিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যুক্ত করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। তার মতে, বিশেষায়িত বিভাগগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা বুঝে গবেষণা ও পাঠ্যক্রম সাজাতে হবে।
পরিকল্পনা ছাড়াই বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা ও অবকাঠামোর সঙ্কটের মধ্যেই দেশে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বাড়ছে। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে এক দিনেই ১০টি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু কোনো জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই, এমন যুক্তিতে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেয়া ঠিক নয়।
কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষার্থী প্রয়োজন, কোথায় কী ধরনের উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন কতটা ব্যবহার হচ্ছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গবেষণায় কী অবদান রাখবে- এসব বিষয় আগে যাচাই করা দরকার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাদাত হোসেন বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করতে হবে। সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে কি না, কোন বিষয়ে পড়ানো হবে, যোগ্য শিক্ষক কোথা থেকে আসবেন, গবেষণার অর্থায়ন কিভাবে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের মান কিভাবে ধরে রাখা হবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নির্ধারণে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও দূরত্ব, সম্ভাব্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক সরবরাহ, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং গবেষণার প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। 
সংখ্যা নয়, মান নিশ্চিত করাই জরুরি
শিক্ষাবিদদের মত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো সহজ; কিন্তু একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত অর্থ, আধুনিক গবেষণাগার ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। শুধু ভবন নির্মাণ বা নিয়োগ দিয়ে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, পুরনো যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায় থেকেই গবেষণায় যুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগও বাড়ানো প্রয়োজন।

Advertisement