জলবায়ু-সহনশীল কৃষির পথে পাঁচ জেলা
  • ১৩ লাখ টন ধানের সমপরিমাণ ফসলহানি, পুনর্গঠনে বড় উদ্যোগ
  • পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলায় কৃষি পুনর্গঠনে ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্প

বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল ফসলের মাঠ, ভেঙে পড়েছিল হাজারো কৃষকের স্বপ্ন ও জীবিকার ভিত্তি। ২০২৪ সালের আগস্টে পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৮৩ শতাংশ জমির দাঁড়ানো ফসল নষ্ট হয়, যার পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ টন ধানের সমান। সেই বিপর্যয় কাটিয়ে কৃষিকে নতুন করে দাঁড় করাতে ২৬০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে পুনর্গঠন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে ৪০টি উপজেলায় আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষকের জীবন-জীবিকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এ জন্য বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার বাস্তবায়ন করছে ‘বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং)-কৃষি ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার কম্পোনেন্ট’।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক উদ্যোগে প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। তাৎক্ষণিকভাবে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে প্রকল্পটি।
ডিএই অঙ্গের প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় পূর্বাঞ্চলের কৃষি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। কেবল তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে এ বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি,  উন্নত সেচ অবকাঠামো ও কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বি-স্ট্রং প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষায়িত লিড ফার্মারস গ্রুপ গঠন করে উন্নত বীজ উৎপাদন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্যোগের মধ্যেও কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা যায়।
কৃষকের দক্ষতা ও বীজের নিশ্চয়তা : প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের আওতায় ৪০টি উপজেলায় ৫৯৪টি লিড ফার্মারস গ্রুপ গঠন করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রুপে ৩০ জন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ তরুণ কৃষকের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপ পরিচালনায় রয়েছে ৯ সদস্যের কার্যকরী কমিটি। গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আরো তিন থেকে পাঁচজন সাধারণ কৃষককে উন্নত কৃষি কৌশল শেখাবেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের একটি কৃষকভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। কৃষকদের দক্ষতা বাড়াতে এক দিনব্যাপী ৭১২ ব্যাচে ২১ হাজার ৩৬০ জন কৃষক এবং তিন দিনব্যাপী ৫৯৪ ব্যাচে ১৭ হাজার ৮১০ জন লিড ফার্মারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রকল্প মেয়াদে সবমিলিয়ে ৩৯ হাজার ১৮০ জন সুবিধাভোগীকে প্রত্যক্ষ আধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আয়োজন করা হবে ৫৮০টি মাঠ দিবস।
স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৪০টি উপজেলায় গড়ে তোলা হচ্ছে ৮৬টি সিড ভিলেজ বা বীজ প্রযুক্তি গ্রাম। এসব গ্রামে উন্নত জাতের ধান, গম, ডাল, তেল ও মসলাবীজ উৎপাদন এবং নিরাপদ সংরক্ষণের প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রকল্প শেষে এসব বীজ গ্রাম থেকে এক হাজার ১৪৫ টন ধানবীজ, ৯৫ টন গমবীজ, ৮০ টন ডালবীজ এবং ৫০ টন তেলবীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়বে এবং বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমবে।
যান্ত্রিকীকরণে কমবে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের পাশাপাশি কৃষিতে শ্রমিক সঙ্কট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় গঠিত কৃষক গ্রুপগুলোর মধ্যে আধুনিক কৃষিযন্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ৫৯৪টি লিড ফার্মারস গ্রুপের মধ্যে যেসব গ্রুপ যন্ত্রপাতি গ্রহণ ও দলগতভাবে ব্যবহারে আগ্রহী, তাদের এসব সরঞ্জাম দেয়া হচ্ছে। প্রথম বছরে পাওয়ার থ্রেশার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, তেল ভাঙানোর মেশিন, বীজ সংরক্ষণের জন্য ইরি কুকুন ও মিনি সাইলো এবং সেচের জন্য লো লিফট পাম্প (এলএলপি) বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২২৬টি ট্রে-সহ রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ৮৬টি পাওয়ার থ্রেশার ও ৮২টি যান্ত্রিক শস্য শুকানোর ড্রায়ার সরবরাহ করা হচ্ছে। বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে ৩০৬টি ইরি কুকুন, পাঁচ হাজার ১০৪টি শক্তিশালী প্লাস্টিকের বীজ সংরক্ষণ পাত্র, ৩০৮টি তেল নিষ্কাশন মেশিন, ৮০টি ধান-ভুট্টার পাফ তৈরির খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র এবং ৫৮৫টি এলএলপি সেচ পাম্প। এসব পাম্পের সাথে রয়েছে ৩০০ মিটার থ্রেড পাইপ।
জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে সেচ ও উৎপাদন : ফলবাগানে পানির অপচয় কমাতে প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৫০০টি সৌর শক্তিচালিত ড্রিপ সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তিতে প্রতিটি গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি সরবরাহ করা হয়। এতে সেচের দক্ষতা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং বিদ্যুৎ খরচ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।
উচ্চমূল্যের গ্রীষ্মকালীন সবজি ও সুস্থ-সবল চারা উৎপাদনে নির্মাণ করা হচ্ছে ৪৬টি জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত পলিশেড হাউজ। তীব্র তাপপ্রবাহ কিংবা অতিবৃষ্টির মধ্যেও এসব স্থাপনায় সুরক্ষিত পরিবেশে চারা উৎপাদন সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে অন্তত ৪৬ জন স্থানীয় তরুণের কৃষি-উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্প এলাকার চার হাজার ব্লকে মালচিং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মালচিং পেপার ব্যবহারে জমির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও সারের অপচয় কমানো সম্ভব। এতে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমিয়ে বিষমুক্ত ও উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতেও নেয়া হয়েছে উদ্যোগ। ৬৯০টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে পুকুরপাড় ও মাছের ঘেরের অব্যবহৃত সীমানায় সবজি ও ফল চাষ করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৫৫ হেক্টর পতিত জমি নতুন করে কৃষির আওতায় এসেছে। দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে দুই হাজার ৭৬০টি ক্রপিং প্যাটার্নভিত্তিক প্রদর্শনী চালু করা হচ্ছে।
নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণে পুষ্টি ও কর্মসংস্থান : বি-স্ট্রং প্রকল্পে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ও তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিটি লিড ফার্মারস গ্রুপে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী ও ২০ শতাংশ তরুণ রাখার শর্ত রয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনায় পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের জন্য তিন শতক আয়তনের দুই হাজার ৬০০টি কমিউনিটি হোমস্টেড গার্ডেন গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব বাগানে নারীরা বছরজুড়ে শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনীয় উপকরণ ও উন্নত বীজও সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবহৃত জমিতেও সবজি বাগান স্থাপন করা হচ্ছে।
বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমিতে পানি জমে থাকায় সবজি চাষের ক্ষতি এড়াতে জিও ব্যাগে চাষের প্রযুক্তি চালু হয়েছে। এক লাখ ৪৭ হাজার ১০০টি জিও ব্যাগে দুই হাজার ৯৪২টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে আদা, হলুদ, মরিচ ও গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ করা হচ্ছে। বাড়ির আঙিনা কিংবা উঁচু মাচায় এসব বস্তা রেখে চাষাবাদ করা যায় বলে জলাবদ্ধতার মধ্যেও উৎপাদন অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ফলবাগানে ড্রিপ সেচ, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন, পলিনেট হাউজে উন্নত চারা তৈরি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো উচ্চমূল্যের কৃষি উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফসল উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য : প্রকল্পের আওতায় ১১টি নির্দিষ্ট প্রযুক্তির ওপর মোট ২০ হাজার ২২৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও খরা সহনশীল জাতের প্রচার এবং বিকল্প ভেজা ও শুকানো (এডব্লিøউডি) পদ্ধতির তিন হাজার প্রদর্শনী রয়েছে। এসব প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় সামগ্রিক ফসল উৎপাদন অন্তত ২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শস্য বহুমুখীকরণের ফলে ধান উৎপাদন ৪ শতাংশ, তেলবীজ উৎপাদন ৩ শতাংশ এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে প্রকল্পের মূল্যায়নে আশা করা হয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ৪৩০টি ভার্মিকম্পোস্ট ও ট্রাইকোকম্পোস্ট ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ইউনিট থেকে দুই হাজার ১৫০ মেট্রিক টন উন্নত জৈবসার উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে।
বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে পূর্বাঞ্চলের কৃষিকে নতুনভাবে সংগঠিত করার পাশাপাশি উৎপাদন, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বি-স্ট্রং প্রকল্প। উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু-সহনশীল চাষাবাদের সমন্বয়ে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব প্রযুক্তি কতটা কৃষকের নিয়মিত চাষাবাদে যুক্ত হচ্ছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষে স্থানীয় কৃষক গ্রুপগুলো কতটা স্বনির্ভরভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে, তার ওপর।

Advertisement