
রফিকুল হায়দার ফরহাদ, আন্ডারচর (পটুয়াখালী ) থেকে ফিরে
‘আমরাই বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বসবাসকারী। আমাদের এই আন্ডারচরের পরে বাংলাদেশীদের আর কোনো জনবসতি নেই। এরপর শুধুই সাগর আর সাগর।’ গর্বের সাথেই কথাগুলো বলছিলেন আন্ডারচরের বাসিন্দা আজগর মৃধা মোহাম্মদ, মোহাম্মদ নাহিদ তালুকদাররা। তাদের অবশ্য ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে তথ্য দেয়া হলো, আপনারা নন, বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জনবসতি হলো কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনের লোকজন। তথ্যটি তাদের পছন্দ হয়েছে বলে মনে হলো না। তবে এটা সত্য, বাংলাদেশের না হলেও পটুয়াখালী জেলার সর্বদক্ষিণের জনবসতি এই আন্ডারচরে। স্থানীয়রা একে চরআন্ডা বলে। বহু বছর আগে এই চরের বালু এবং জঙ্গলে প্রচুর পাখি ডিম পাড়তো। ডিমকে স্থানীয় ভাসায় আন্ডা বলে। তাই এই চরের নাম দেয়া হয়েছে আন্ডারচর বা চরআন্ডা। নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এই আন্ডারচরের মানুষ একই সাথে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন গরু-চোরের উৎপাতে। এই চোররা একেক দফায় ৪০-৫০টি গরু মহিষ চুরি করে নিয়ে যায়। নাহিদ তালুকদার জানান, এক পরিবারের ৯০টি গরু ও মহিষ নিয়ে গেছে চোররা।
অনেক দর্শনীয় ও দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী জেলা। এর মধ্যে একেবারেই বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন হলো চর মোন্তাজ। এই চর মোন্তাজ ইউনিয়নেরও বিচ্ছিন্ন চর বা দ্বীপ এই আন্ডারচর। চর মোন্তাজ লঞ্চঘাট থেকে ট্রলার ছেড়ে যায় আন্ডারচরের উদ্দেশে। খেয়াও আছে। এ ছাড়া গলাচিপা উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ গইনখালী, চরমন্ডল, চর মোন্তাজ হয়ে যায় আন্ডারচরে। আন্ডারচরই শেষ ঘাট। আন্ডারচরে দু’টি নৌঘাট। একটি উত্তর দিকে। অপরটি পশ্চিম দিকে। লঞ্চ ভিড়ে পশ্চিম দিকের ঘাটে। তবে চর মোন্তাজের আগেই এই চরে লোকবসতি শুরু হয়েছে। জানান স্থানীয়রা।
চর মোন্তাজ থেকে দুই ভাবে যাওয়া যায় আন্ডারচরে। লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চ, খেয়া বা ট্রলারে। অন্য দিকে চর মোন্তাজের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত খেয়াঘাট থেকে খেয়ায় সেখানে যাওয়া যায় আন্ডারচর নদী পেরিয়ে। সময় লাগে ১০-১২ মিনিটের মতো। চর মোন্তাজ ঘাট থেকে লঞ্চে গেলে ৪৫ মিনিট সময় ব্যয় হয়। এরপর মোটরসাইকেলে বা হাঁটাপথে যেতে হবে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার ভেতরের মূল বাজারে। কোনো অটোরিকশা নেই এই আন্ডারচরে।
চরআন্ডা নদী বিভক্ত করেছে চর মোন্তাজ ও আন্ডারচরকে। যেহেতু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এই চরআন্ডা। তাই অন্য বিচ্ছন্ন দ্বীপের মতো জন দুর্ভোগের শেষ নেই । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে একটি প্রাইমারি স্কুল ও তিনটি মাদরাসা। নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ওষুধের দোকানে বসে ওষুধ বিক্রি করা ব্যক্তিরাই বড় ডাক্তার এই চরে। ফলে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাদের যেতে হয় জেলার গলাচিপা উপজেলায়। সেখানে যেতে ট্রলারে লাগে চার ঘণ্টার মতো। প্রথমে তাদের আন্ডারচর নদী পেরিয়ে আসতে হয় চর মোন্তাজে। এরপর মোটরসাইকেল বা অটোতে চর মোন্তাজ ঘাটে। সেখানে থেকে রিজার্ভ ট্রলার নিয়ে যেতে লাগে চার-পাঁচ হাজার টাকা। আর অতি জরুরি প্রয়োজনে স্পিডবোট ভাড়া নিলে ৮-১০ হাজার টাকা পকেট থেকে বের করতে হয়। আন্ডারচর থেকে নিয়মিত রুটের লঞ্চে উঠে গলাচিপা যাওয়া যায়। স্থানীয় রফিকুল ইসলাম জানান, আন্ডারচর থেকে চর মোন্তাজ হয়ে গলাচিপা যেতে যে সময় লাগে বাসে ঢাকা যেতেও এত সময় লাগে না। আন্ডারচরের অবস্থান মিনি সুন্দরবন খ্যাত সোনারচরের উত্তর-পূর্বে। এই চরে পাঁচ হাজার লোকের মাস। এর মধ্যে ভোটার ১৪০০। এটি চর মোন্তাজ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড। একটি মাত্র সাইক্লোন শেল্টার। এতে বহু কষ্টে দেড়শত জন লোক আশ্রয় নিতে পারে ঘূর্ণিঝড়ের সময়। গবাদিপশুদের তখন আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করে ছেড়ে দিতে হয়। আজগর মৃধা ও নাহিদ তালুকদারের দাবি, যদি উঁচু টিলা (যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে কিল্লা) করে দেয়া যায় তাহলে সামুদ্রিক ঝড়ের সময় গরু-মহিষগুলোকে এই উঁচু স্থানে রাখা সম্ভব। জলোচ্ছ্বাস হলে এই গবাদিপশুগুলোকে রক্ষা করা যাবে। কিন্তু তা না থাকায় পানিতে ভেসে যায় প্রাণীগুলো।
২০০৭ সালের সিডরের সময় আন্ডারচরের ৯ জন মানুষ মারা গিয়েছিল। এর মধ্যে আজগর মৃধাই হারিয়েছেন তার পরিবারের বাবা-মাসহ পাঁচ সদস্যকে। আজগর জানান, সাধারণত আমাদের এলাকায় ঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাস আসে পূর্ব দিক থেকে। কিন্তু সিডরের সময় এই পানি আন্ডারচরে প্রবেশ করে পশ্চিম দিক থেকে। আমার আব্বা-আম্মারা পূর্ব দিক থেকে পানি আসবে ভেবে চরের পশ্চিম দিকে চলে আসছিলেন। অথচ সেই পানি পশ্চিম দিক থেকে এসে তাদের ভাসিয়ে নেয়। সাথে ছিল আমার ভাইয়ের স্ত্রী ও এক ভাগ্নি। আব্বা আর ভাগ্নির লাশ আর পাইনি। অন্যদের বিলে, নিচু জমিতে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। এই ৯ জনের মধ্যে একজন ছিলেন অন্য এলাকার। এই চরের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস সাগরে মাছ শিকার আর কৃষিকাজ। বর্ষায় তাদের মাছ ধরার মৌসুম। ইলিশ মাছই তাদের প্রধান শিকার। এ ছাড়া পোয়া, নদীর পাঙ্গাশ, রিঠা, দাতিনা কোরালা, বৈরাগী, রামসুস বা তপসী, পারশে, পাইশ্যে মাছসহ নানান জাতের মাছ ধরেন তারা। আর কৃষি আবাদ বলতে আমন ধান ও তরমুজের চাষ।
এই আন্ডারচরের সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম ২০২২ সালে। চর মোন্তাজ থেকে সোনারচরে যাওয়ার সময় বাম দিকে পড়েছিল। তখন আর যাওয়া হয়নি। গত বছর সোনারচরের দক্ষিণে শিপচরে যাওয়ার সময় আমরা সোনারচর ও আন্ডারচরের মাঝে বয়ে চলা নদী পেরিয়ে ট্রলারে করে যাচ্ছিলাম। তখন উত্তর পাশে দেখা মিলল দারুণ এক বিচের। নাম জানতেই ট্রলারের মালিক ও চালক শহীদুল ইসলাম জানান, এটি আন্ডারচরের বিচ। পর্যটকরা কেউ এই বিচে যায় না। আমার প্রবল ইচ্ছে ছিল ওই বিচে যাওয়ার। কিন্তু ছোট নৌকা সাথে না থাকায় যেতে পারিনি। ছোট নৌকা ছাড়া সেখানে যাওয়া যায় না। গভীরতা একেবারেই কম। আমাদের সাথে ছিল বড় ট্রলার। যেগুলো গভীর সাগরে যায়। শহীদুল ভাইয়ের ক্যারিং বোট নামের ওই ট্রলার নিয়ে আমরা তখন দুই ঘণ্টার সাগর ভ্রমণ করে শিপচরে যাচ্ছিলাম।
তিন দিকে নদী। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। অর্থাৎ পুরোপুরি নদী ও সাগর বেষ্টিত এই আন্ডারচর। অথচ নেই কোনো বেড়িবাঁধ। ফলে জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি রাস্তা তলিয়ে যায় এখানে। চর মোন্তাজে যাওয়ার খেয়াঘাট থেকে দক্ষিণে আন্ডারচরের মূল বাজারে যাওয়ার যে রাস্তা সে দিকে আঙুল দেখিয়ে নাহিদ মৃধা জানান, ‘প্রতি বর্ষায় তিন চারবার করে ডুবে যায় এই রাস্তা। তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি। এতে আমাদের ভোগান্তির অন্ত থাকে না।’
১০ কিলোমিটার আয়তনের এই আন্ডারচরে একটি আধা সরকারি প্রাইমারি স্কুল। রয়েছে তিনটি মাদরাসা। দ্বীপবাসীর নামাজ পড়ার জন্য রয়েছে ছয়টি মসজিদ। তবে নেই কোনো মাধ্যমিক স্কুল। কলেজ থাকার তো প্রশ্নই আসে না। ফলে মাধ্যমিক স্কুলে পড়তে হলে চর মোন্তাজে গিয়ে পড়তে হয়। আর কলেজে পড়া মানে রাঙ্গাবালী উপজেলায় গিয়ে পড়া। তবে কোনোভাবেই প্রতিদিন সরাসরি আন্ডারচর থেকে রাঙ্গাবালী গিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ নেই। রাঙ্গাবালীতে বাসা ভাড়া নিয়েই পড়তে হয়। জানান উঠতি বয়সের ইব্রাহিম সিকদার। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘একেতো এলাকায় নেই মাধ্যমিক স্কুল। সাথে আর্থিক দুরবস্থা। ফলে পঞ্চম শ্রেণীর বেশি আর লেখাপড়া করা হয়নি আমার।’
আন্ডারচরের জেলেদের সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের কবলে পড়তে হয়। ৮-১০ বছর আগে এই অত্যাচারটা বেশি ছিল। এ বছরও কিছু ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে সাগরে। জানান নাহিদ তালুকদার। তবে গরু ও মহিষ চোরদের অত্যাচারে বিষিয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা। নাহিদ তালুকদারের দেয়া তথ্য, গত বছর আমার পাঁচটি মহিষ চোররা নিয়ে গেছে। সোনারচরে বন বিভাগকে ম্যানেজ করে আমি সেখানে পাঁচটি মহিষ ঘাস খাওয়ানোর জন্য দিয়েছিলাম। পরে সেই মহিষ আর পাইনি। আমার একেকটি মহিষের দাম ছিল এক লাখ টাকা করে। আন্ডারচরে ভালো সাইজের একটি গরুর দাম ৭০-৮০ হাজার টাকা করে। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে আমাদের এলাকার ৫০-৬০টি গরু-মহিষ হারিয়ে গেছে। চোররা নিয়ে গেয়ে এই গবাদিপশুগুলো। তারও আগের বছর আগে আমাদের এলাকা থেকে ৯৫টি গরু ও মহিষ চুরি হয়েছে। তার আফসোস, আমাদের এই নদীবেষ্টিত এলাকা থেকে কিভাবে যে চোররা এই গরু-মহিষগুলো নিয়ে যায় টেরই পাই না।
চর মোন্তাজ থেকে আন্ডারচরেগামী খেয়াঘাটের অবস্থা ভালো নেই। যাত্রীদের নির্বিঘেœ পারাপারের জন্য সাঁকোর বদলে সিমেন্টের ঢালাই করা রাস্তা করে দেয়া হয়েছিল। তা মাঝখান দিয়ে ভেঙে দেবে গেছে। ফলে পিচ্ছিল এই রাস্তা খুবই সাবধানে পার হতে হয়। স্থানীয়রা যে খেয়াতে করে নদী পার হন সেই খেয়াতে গরু ছাগলও বহন করা হয়। খেয়াঘাটে দেখলাম ছোট একটি রুগ্ণ বাছুরকে তিনজনে মিলে খেয়াতে তুলতে। দামের কথা জানতেই উত্তর, ‘৩০ হাজার টাকা’। পাশের সোনারচর, চর হেয়ারে প্রচুর পর্যটক যান। অথচ আন্ডারচরে কোনো পর্যটকই যান না। এ নিয়ে আফসোস আন্ডারচর ওয়ার্ডের মেম্বার বেলায়েত হোসেন লোকমানের। জানান, ‘আমাদের চরের দক্ষিণ-পূর্বে চমৎকার একটি বিচ আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পর্যটক এখানে আসেনি। পর্যটকরা এলে স্থানীয়রাও আর্থিকভাবে লাভবান হতো। ভ্রমণপিপাসুরাও আমাদের এলাকাটা ঘুরে দেখতে পারতেন।’ তার দেয়া তথ্য, ‘পাঁচ-ছয় বছর আগে বিদ্যুৎসংযোগ লেগেছে আমাদের এলাকায়।’ গরু-মহিষ চোরের উৎপাত নিয়ে মেম্বার বেলায়েত জানান, আমরা অতিষ্ঠ এই চোরদের কারণে। আগেতো বিচার সালিশ করে আমরা বেত দিয়ে পিটিয়ে এই চোরদের শায়েস্তা করতাম। এতে চুরি কমতো। এখনতো সালিশে পিটানোর নিয়ম নেই। ফলে চুরি চলছেই। চোরদের ধরে পুলিশে দিয়ে কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে আবার চুরি করে। তার অভিযোগ, ‘আমাদের স্থানীয় কিছু চোরের সাথে বাইরের চোরদের যোগাযোগ আছে। তা না হলে কয়েক মাস পরপর কিভাবে এলাকা থেকে এভাবে গরু-মহিষ চুরি হয়।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








