
আশরাফুল ইসলাম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্য দিকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি- এই দুইয়ের প্রভাবে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাজারে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ২৮ অক্টোবর ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৪ থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা। ওই দিন ব্যাংকগুলোর মোট ডলারের চাহিদা ছিল প্রায় ৮০ কোটি ডলার। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয় তুলনামূলক কম আসা এবং বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থ পরিশোধের দায় থাকায় ডলারের বাজারে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের বৈদেশিক পেমেন্ট বাড়লে ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এর আগে ১৯ অক্টোবরও ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক দুই কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একাধিকবার বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী কাজ করেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। পরিবারের ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয় মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া কিংবা নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এর আগে সতর্ক করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। তবে যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স ইতোমধ্যে কতটা কমেছে, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রকৃত প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মাসভিত্তিক ওঠানামা দেখেই যুদ্ধকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে জ্বালানি ও পণ্য আমদানিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশকে একই পরিমাণ পণ্য আমদানির জন্য আগের তুলনায় বেশি ডলার ব্যয় করতে হয়। এর সাথে পরিবহন, জাহাজভাড়া ও বীমা ব্যয় বাড়লে আমদানি ব্যয়ের চাপ আরো তীব্র হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের দাম, পরিবহন এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এসব ব্যয় বৃদ্ধি দেশের আমদানি বিল বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। অন্য দিকে, রেমিট্যান্সের প্রবাহ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। তখন আমদানিকারকদের প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করতে ব্যাংকগুলোকে বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে হতে পারে। এর প্রভাব পড়ে ডলারের বিনিময় হারে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি একটি প্রচলিত নীতিগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার পেতে পারে। একই সাথে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদাজনিত অস্থিরতা কমানো সম্ভব হয়। তবে এ পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ডলারের ঘাটতি থাকলে বারবার রিজার্ভ ব্যবহার করা টেকসই সমাধান নয়। এ জন্য রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, রফতানি আয় বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি জরুরি। ডলারের দাম বাড়লে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য আমদানি পণ্যের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। আমদানিকারকরা বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সাথে যুক্ত করলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়ে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ কঠিন হতে পারে। একই সাথে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অন্য দিকে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ দুর্বল হলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে অর্থনীতির ওপর একাধিক দিক থেকে চাপ সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহে সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত চাপে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ধারাবাহিকতা বাড়ানো, আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








