
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুমের তদন্ত এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন- এসব প্রশ্ন বাংলাদেশের সংস্কার-আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ড. নাবিলা ইদ্রিসের মতে, কেবল সরকার পরিবর্তন কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন দিয়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে এবং একই সাথে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। নিচে ড. নাবিলা ইদ্রিসের সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব-
প্রশ্ন: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে কমিশন যেন স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে, সেই ক্ষমতা থাকতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা চেয়েছিলাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারুক। কিন্তু সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন করা হয়েছে। তবে আমার মূল্যায়ন হলো, নতুন আইনেও কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নটির যথাযথ সমাধান হয়নি।
একটি কমিশন যদি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেটি কার্যত আরেকটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মতো হয়ে যেতে পারে। তখন অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা কিংবা জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়। অথচ মানবাধিকার কমিশনের অন্যতম কাজই হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা।
যে প্রতিষ্ঠানকে অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, তাকে সেই প্রতিষ্ঠানের অধীন রাখলে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কমিশনের নিয়োগ, কাজের পরিধি, তদন্তের ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কমিশনগুলো কি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত কাজে আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। কোনো কমিশন বা সংস্কার উদ্যোগকে সফল করতে হলে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়। সরকার যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ থাকে না।
তবে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ না থাকাই যথেষ্ট নয়। কমিশনের আইনি ক্ষমতা, কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হবে। আইন যদি স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা না দেয়, তাহলে সরকার দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপ না করলেও কমিশন প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না।
প্রশ্ন : নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের কী শেখার আছে?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : পুলিশ কমিশন নিয়ে আমি সরাসরি কাজ করিনি। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর পুলিশ কমিশন সম্পর্কে নির্দিষ্ট তুলনামূলক মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে যথাযথ হবে না। তবে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নটিও গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশেও গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে বলে আমি মনে করি না।
প্রশ্ন : মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করলে কি কার্যকারিতা বাড়বে?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করলেই কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয় না। অতীতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ড. মিজান পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্য ব্যক্তিরাও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তাদের অনেকের কাজ দৃশ্যমান হয়নি। কারণ, কমিশনকে এমনভাবে কার্যকর করা যায়নি, যাতে মানুষ তার কাজের ফল দেখতে পায়।
এখানে ব্যক্তির যোগ্যতার পাশাপাশি আইনি ক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান যদি আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে ব্যক্তিগত সদিচ্ছা দিয়ে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। কমিশনের ক্ষমতা সীমিত থাকলে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর না করে শুধু পদ সৃষ্টি, নিয়োগ এবং বেতন-ভাতা চালু রাখলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। দেখতে হবে, চেয়ারম্যান কী করতে পারছেন, কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন এবং তার সিদ্ধান্তের কী ফল হচ্ছে।
প্রশ্ন : সরকার পরিবর্তন হলেই কি মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : সরকার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে স্থায়ী সমাধান নয়। যে কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার সম্ভব, সেই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে নতুন সরকারও একই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।
দেখতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কাজ করছে। পুলিশ কি রাজনৈতিক নির্দেশের বাইরে থেকে আইন প্রয়োগ করতে পারছে? মানবাধিকার কমিশন কি স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্ত করতে পারছে? কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কার্যকর প্রক্রিয়া আছে কি না? নাগরিকরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছেন কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই বোঝা যাবে সংস্কার কতটা কার্যকর হয়েছে।
প্রশ্ন : সাম্প্রতিক সময়ে একজন নারী উদ্যোক্তাকে গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং যথাযথপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। কাউকে গ্রেফতার করার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়া এবং গ্রেফতারের আগে বা যথাযথ প্রক্রিয়ায় অভিযোগ সম্পর্কে জানিয়ে জবাব দেয়ার সুযোগ দেয়া এক বিষয় নয়।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড থাকা উচিত নয়। ক্ষমতাসীন বা উচ্চপদস্থ কেউ নিজের বক্তব্যকে রূপক অর্থে বলা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ পাবেন, অথচ সাধারণ নাগরিক একই ধরনের সুযোগ পাবেন না- এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
কেউ আইন ভঙ্গ করেছেন কি না, সেটি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়। গ্রেফতার হলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। আবার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় থাকার কারণে কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও রাখা যায় না।
প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। কিন্তু কার্টুন আঁকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেয়ার কারণে গ্রেফতারের অভিযোগও রয়েছে। এই পরিস্থিতি কিভাবে দেখছেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : বিষয়টি আমার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়। একদিকে বলা হচ্ছে, মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্টুনও আঁকতে পারবেন। অন্যদিকে কার্টুন আঁকা বা প্রকাশের কারণে মানুষকে গ্রেফতার করার অভিযোগ উঠছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কার্টুন তৈরি করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কারণে কাউকে গ্রেফতার করা হলে দেখতে হবে, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী এবং কোন আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র বা সমালোচনামূলক প্রকাশের কারণে কাউকে গ্রেফতার করা হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু সরকারের পক্ষে কথা বলার অধিকার নয়; সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও এর অংশ। আইনগত সীমা থাকতে পারে, কিন্তু তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা বজায় রাখতে হবে।
প্রশ্ন : সাইবার আইন পরিবর্তন এবং গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কী?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আইন পরিবর্তন হলেই মানবাধিকার সুরক্ষিত হয় না। দেখতে হবে, নতুন আইন নাগরিকের অধিকার রক্ষা করছে কি না, অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করছে কি না এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে পারছে কি না।
গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। একইভাবে সাইবার আইন বা অন্য কোনো আইনে শাস্তির বিধান থাকলেই যথেষ্ট নয়; আইনটি যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন আইনে কোন ধরনের অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, কী শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তদন্তের ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে- এসব বিষয় নির্দিষ্ট আইন ও বিধান দেখে মূল্যায়ন করতে হবে। মূল নীতি হলো, অপরাধের বিচার হতে হবে, কিন্তু আইন যেন নির্বিচার গ্রেফতার কিংবা ভিন্নমত দমনের মাধ্যম হয়ে না ওঠে।
প্রশ্ন : সরকার বলছে, তারা গুম সমর্থন করে না। কিন্তু গুমের অভিযোগ তদন্তের স্বাধীনতা ও অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ড. নাবিলা ইদ্রিস : কোনো সরকার গুম সমর্থন করে না বললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গুমের অভিযোগ এলে কিভাবে তদন্ত হচ্ছে, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে কী সহায়তা দেয়া হচ্ছে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।
তদন্তের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অভিযোগের সাথে জড়িত থাকার সম্ভাবনা থাকলে তদন্ত এমনভাবে করতে হবে, যাতে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি না হয়। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষমতা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং তার পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষাকে কিভাবে দেখছেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং তার পরিবারের অপেক্ষা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের একজন সদস্যকে খুঁজে না পাওয়া মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু তদন্ত চলছে বললেই যথেষ্ট নয়। তদন্তের অগ্রগতি কী, কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং পরিবারকে কী জানানো হচ্ছে- এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারকে প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের জানার অধিকার রয়েছে, তাদের স্বজনের কী হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন : সংস্কার কমিশনগুলোর কাজে সরকারের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : কমিশন গঠন করাই শেষ কথা নয়। কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের স্পষ্ট প্রক্রিয়া রাখতে হবে।
কমিশনের কাজ যদি আগে থেকেই নির্ধারিত রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়, তাহলে স্বাধীন মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কমিশনগুলোকে সরাসরি হস্তক্ষেপমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দেয়া ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে আইনি স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। সরকার পরিবর্তনের সাথে যেন কমিশনের ক্ষমতা ইচ্ছামতো বদলে না যায়, সেই সুরক্ষা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : তাহলে সংস্কারের মূল বাধা কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : রাজনৈতিক সদিচ্ছা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যাটি শুধু সদিচ্ছার নয়; ক্ষমতার কাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সরকার ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করলেও সব ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে ভবিষ্যতে সেই ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যেগুলো কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না। আজ একজন ভালো ব্যক্তি দায়িত্বে থাকলে প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করবে, আর কাল অন্য কেউ দায়িত্বে এলে পুরো ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়বে- এমন হওয়া উচিত নয়। দায়িত্ব পালনের নিয়ম, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি ব্যক্তির পরিবর্তনের সাথে বদলে যাবে না- এমন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্ন : বর্তমান সংস্কার-আলোচনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আমার কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। বিভিন্ন সংস্কার নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু সেগুলোকে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে। জুলাই সনদে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণসহ রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো পরিবর্তনের যে বিষয়গুলো এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই প্রশ্ন বারবার সামনে এনে নতুন করে সম্মতি চাওয়ার পরিবর্তে আগে পাওয়া জনমতের বাস্তবায়নের দিকে এগোনো প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত থাকলে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আইন পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না। ক্ষমতার ভারসাম্য, বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলেই রাতারাতি সব অপরাধ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হতে পারে। এরপর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
প্রশ্ন : মানবাধিকার সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে আপনার শেষ কথা কী?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে আইনের অধীন করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করা। কোনো ব্যক্তি বা সরকার যেন নিজের ইচ্ছাকে আইনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।
পুলিশকে আইন মেনে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে, আবার আইন ভঙ্গ করলে তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা যায়। একই সাথে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমস্যাকে শুধু কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যাবে না। ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে, কিন্তু একই ধরনের সমস্যা বারবার ঘটলে প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থারও পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যক্তি বদলানো দরকার হতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি ব্যবস্থাও বদলাতে হবে। অন্যথায় একই সঙ্কট আবার ফিরে আসবে।
প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আপনাকেও ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








