১১ দলের খুলনা অভিমুখে লংমার্চ আজ
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর এবার খুলনা বিভাগ অভিমুখে লংমার্চ করতে যাচ্ছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সাত দফা দাবিতে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দু’টি জনসভা এবং ৬টি পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। আজ শনিবার সকালে বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু হয়ে প্রথমে খুলনা এরপর যশোর-ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হবে। এ কর্মসূচির বহরে দেড় হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন জামায়াত নেতারা। কুষ্টিয়ায় সমাপনী সমাবেশে কয়েক লাখ মানুষের সমাগমের  প্রত্যাশাও করছেন তারা।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি সামনে রেখে এ লংমার্চ করছে ১১-দলীয় ঐক্য। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস ও সারের সঙ্কট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।
লংমার্চ ঘিরে প্রস্তুতি শেষ করেছে জামায়াতসহ ১১ দল। গত কয়েক দিনে পথসভা ও সমাবেশের স্থানগুলোয় মঞ্চ তৈরি, প্রচারপত্র বিতরণ, মাইকিং ও গণসংযোগ চলছে। গতকাল বিকেলে জামায়াত সেক্রেটারিসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা বায়তুল মোকাররমের সকালের সমাবেশস্থল পরিদর্শন করে যাবতীয় প্রস্তুতির বিষয়টি দেখভাল করেন। আয়োজকদের ভাষ্য, আগের দুটি লংমার্চের তুলনায় এবার তারা বেশি সাড়া পাচ্ছেন।
বায়তুল মোকাররম থেকে যাত্রা
আজ সকাল ৭টায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জনসভার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। পথে ৬টি পথসভা এবং কুষ্টিয়ায় আরেকটি জনসভার মধ্য দিয়ে তৃতীয় দফার লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হবে। এতে নেতৃত্ব দেবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা দিয়ে খুলনা বিভাগের দিকে যাবে গাড়িবহর। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনায় বাবরী চত্বর (শিবাবাড়ী) ও ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ হবে। এর আগে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠে সমাবেশ করার কথা বলেছিল ১১-দলীয় ঐক্য। তবে প্রশাসন আট শর্তে তাদের আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার
ঢাকা থেকে খুলনা-ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া অভিমুখে ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘লংমার্চ’ কর্মসূচির সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরতে গতকাল দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জামায়াত। এ সময় জামায়াত সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল লংমার্চ সফল করতে নিজ নিজ প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সাত দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের সাত দফা দাবির প্রথমটি হচ্ছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। সরকার জনগণের গণরায় অস্বীকার করে রাজনৈতিক সঙ্কটকে আরো গভীর করছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত দু’টি ভোটের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, অথচ অন্যটির ফলাফল অস্বীকার করা দ্বিচারিতা ও জনগণের সাথে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। সরকার আন্তরিক হলে আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। বিরোধী দল এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকে এখনো দেশে-বিদেশে চিকিৎসাধীন। জুলাই গণহত্যার সাথে জড়িত, বিশেষ করে যারা এখনো গ্রেফতার হয়নি, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার ও জ্বালানি সঙ্কটের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। একই সাথে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারকে অবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরো বলেন, দেশে হত্যা, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং এবং রাজনৈতিক সংঘাত বেড়েই চলেছে। এমনকি সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক দলীয়করণ চলছে। সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের সর্বত্র দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ নিয়োগ, ডিলারশিপ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হাটবাজার, ঘাট, বালুমহাল, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তন হয়নি শুধু চাঁদাবাজদের পরিচয় ও দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে শুরু করে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ মোট ১৯টি জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ লংমার্চে অংশ নেবেন। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চ সফল করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক কিছু অসুবিধা হতে পারে। এ জন্য সাধারণ মানুষ, পথচারী, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা মহাসড়কের একটি পাস ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয়।
লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন আচরণ করা যাবে না। পথে নতুন কোনো জেলা থেকে গাড়ি বহরে যুক্ত হলে সেগুলো বহরের একেবারে শেষ প্রান্তে যুক্ত হবে। নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত টিমগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে। অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রী সাথে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক গাড়ির টোলের টাকা নিজ দায়িত্বে প্রস্তুত রাখতে হবে।
তিনি লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
লংমার্চের পথ গোপালগঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা গোপালগঞ্জে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর এবার লংমার্চ ঘিরেও কেউ কেউ সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। তবে ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা বিষয়টিকে আশঙ্কা হিসেবে দেখছেন না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গোপালগঞ্জ বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বিরোধী দলের লংমার্চ ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।  
লংমার্চে দেশবাসীকে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আহ্বান 
৭ দফা দাবিতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চে দেশবাসীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াত। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চ দলীয় কর্মসূচি নয় এটি জাতীয় কর্মসূচি। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, সরকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, জনগণের মতামতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য নীরব থাকতে পারে না। তাই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও মতামত বাস্তবায়ন করতে এবং সরকারি দলের দ্বারা সৃষ্ট জনদুর্ভোগ নিরসনে ১১ দলীয় ঐক্য ৭ দফা দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঘোষিত ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের অভিমুখে এবং ঢাকা থেকে রংপুরের অভিমুখে শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ বাস্তবায়িত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালিত হবে। অতীতের মতো লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণে নেতৃবৃন্দ আহ্বান জানান।  
গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১-দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।