বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জাপানের ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সঙ্কটে জাপানের সহযোগিতা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে একান্ত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অংশ। এই অংশীদারত্বের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি। 

Advertisement

প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত জাপান সফরের ওপর আলোকপাত করে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা  বলেন। প্রধানমন্ত্রী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করেন। এই সফরে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপানের ‘বিগ বি’ বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন অগ্রগতির জন্য বিগ বি’তে উন্নীত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে লজিস্টিক, জ্বালানি ও শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। তবে ভারতের কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, বিগ বির মাধ্যমে ভারতের ভূমিবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হবে। 
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে বৃহত্তর শিল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাপান সরকারের সাথে আলোচনায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতেও তৃতীয় কোনো দেশের উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে। তাদের সাথে বসেই এ ধরনের আলোচনা করতে হবে। জাপানের সাথে এবারের আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে নিয়ে কথা হয়নি। 
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সমুদ্রপথ নিয়ে জাপানের সাথে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, বঙ্গোপসাগর কিংবা সমুদ্রপথ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উপস্থিতির প্রয়োজন হয়।
বিগ-বি ও মাতারবাড়ী প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দলটির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্য আশা করি। এই ইস্যুতে সরকারের অবস্থান বুঝতে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতি পড়তে হবে। না দেখে, না বুঝে বা না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
জাপানের সাথে পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এবং ঋণের সুদ হার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো ঋণ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বিভিন্ন দেশের সাথে প্রকৃত বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে বাংলাদেশ সহজ শর্তের ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ বিনিয়োগ অংশীদার হতে চায়। ব্যবসা হবে পারস্পরিক বিনিয়োগের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
জাপানের ঋণের সুদের হার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান, বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি সুদে জাপানের ঋণ নেয়া হচ্ছে কি না। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি মূলত বেসরকারি খাত সংশ্লিষ্ট। কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অন্যান্য বিকল্পের সাথে প্রতিযোগিতামূলক হবে, এমন বিনিয়োগই গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাছাই করার সুযোগ রয়েছে।
জাপান সফরে রোহিঙ্গা সঙ্কট ও মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সব পর্যায়েই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। জাপান এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তবে সঙ্কটের মূল সমাধান মিয়ানমারের হাতে। দেশটিকে আলোচনায় আসতে হবে এবং সঙ্কট সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ কর্মী নেয়ার খবর নাকচ : জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি কিতামুরা তোশিহিরো এক এক্স পোস্টে জানিয়েছেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে জাপান সরকার। এ দাবির কোনো সত্যতা নেই। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাপান-বাংলাদেশ শীর্ষ  বৈঠকের আলোচনাতেও এ ধরনের কোনো বিষয় ছিল না।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের বিবরণ দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।