
ঈশরদী (পাবনা) সংবাদদাতা
পাবনার ঈশরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩ মিনিটে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে চাপ ও তাপমাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করল।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করা সম্ভব হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা কর্তৃপক্ষ।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো: জহেদুল হাসান জানান, ইউনিট-১ ইতোমধ্যে ধারাবাহিক পরিচালনাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) এক দিন আগে ইউনিটটিকে ‘সি পর্যায়ে’ প্রবেশের অনুমোদন দেয়। এরপরই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়।
তিনি জানান, এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। উৎপন্ন তাপের মাধ্যমে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন চালানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। একই সাথে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বিত কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
শুক্রবারের কার্যক্রম শুরুর পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ আপাতত কেন্দ্রের নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানান, বর্তমানে টারবাইন পরীক্ষা চলছে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছলে আরো এক দফা পরিদর্শন করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি দেয়া হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ দেয়ার আগে ইউনিট-১-কে ‘ডি’ পর্যায়ের আরেকটি সনদও অর্জন করতে হবে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী পর্যায়ে যেতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সূচনা নভেম্বরের মধ্যেই সম্ভব হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করছে পরীক্ষার ফলাফল, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর।
এর আগে ১১ অক্টোবর ইউনিট-১-এ প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ শুরু হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়। তবে এই বিক্রিয়া শুরু হওয়া এবং টারবাইন ঘুরিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এক বিষয় নয়। প্রথমে রিঅ্যাক্টরের তাপ উৎপাদন, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বাষ্প উৎপাদন এবং টারবাইন-জেনারেটরের সমন্বিত কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হয়।
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং প্রক্রিয়ায় এর আগে জ্বালানি লোডিং, প্রাথমিক পদার্থবিদ্যাগত পরীক্ষা এবং বি-২ পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ২৯ অক্টোবর বায়েরা ওই পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে সি পর্যায়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিভিন্ন পরিচালনাগত অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এ পর্যায়ের গুরুত্ব হলো, রিঅ্যাক্টর একা নিরাপদে কাজ করলেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। রিঅ্যাক্টর, কুল্যান্ট সার্কিট, টারবাইন, জেনারেটর, বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জরুরি সুরক্ষাব্যবস্থাকে একযোগে নির্ভুলভাবে কাজ করতে হয়। এ কারণেই প্রতিটি ধাপে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর পর পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করা হয়।
নিরাপত্তা পরীক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব
রূপপুরের ইউনিট-১-এর কমিশনিং প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় চাপমুক্তকরণ ভালভ বা প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) নিয়ে কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। এ কারণে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পেতে বিলম্ব হয়। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল এসে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একাধিক পরীক্ষায় ভালভের কার্যকারিতা সন্তোষজনক প্রমাণিত হওয়ার পর বায়েরা প্রথম ক্রিটিক্যালিটির অনুমোদন দেয়। এ ধরনের ভালভ রিঅ্যাক্টরের ভেতরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এটি শুধু একটি যন্ত্রাংশের পরীক্ষা নয় বরং রিঅ্যাক্টরের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করারও অংশ।
প্রথম ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে রাশিয়ার তৈরি তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত প্রযুক্তির (জেনারেশন ওওও+) দু’টি ভিভিইআর-১২০০ (ঠঠঊজ-১২০০) রিঅ্যাক্টর। প্রতিটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দু’টি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। তবে প্রথম পর্যায়ে পুরো ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন শুরু হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় নেয়া হবে। গ্রিডের সাথে জেনারেটরের সমন্বয় বা সিনক্রোনাইজেশন সফল হওয়াও এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্য দিকে দ্বিতীয় ইউনিটের প্রস্তুতিও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর খবরও জানিয়েছে বাসস। ফলে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি প্রকল্প, ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। নির্মাণকাজের প্রধান ঠিকাদার রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নির্মাণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৬ সালের ঋণচুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার কাছ থেকে ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলারের আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণসহায়তা নির্ধারিত হয়। প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা এবং বাংলাদেশের জনবলকে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ও চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। তবে সময়ের সাথে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পের ব্যয় আরো ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। এতে সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশোধিত সময়সীমা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য ২০২৮ সালের জুন।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা, তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে
রূপপুর চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় একটি নতুন উৎস যুক্ত হবে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকাংশে গ্যাস, কয়লা, তেল ও আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ অবস্থায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বেইসলড বিদ্যুতের উৎস হতে পারে। পারমাণবিক জ্বালানির অল্প পরিমাণ ব্যবহার করে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ফলে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে রূপপুর চালু হলেই বিদ্যুৎ খাতের সব সঙ্কট দূর হবে না। প্রথমত. পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি আমদানি ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত. উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে যুক্ত করার জন্য সঞ্চালন অবকাঠামোর পর্যাপ্ত সক্ষমতা প্রয়োজন। তৃতীয়ত. পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিকিরণ পর্যবেক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি থাকতে হবে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তার মানদণ্ড অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণ ও কমিশনিংয়ের মতো পরিচালন পর্যায়েও নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন তদারকি বজায় রাখতে হবে।
পারমাণবিক যুগে প্রবেশের অপেক্ষা বাংলাদেশের
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু বাংলাদেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপদে পরীক্ষা সম্পন্ন, জাতীয় গ্রিডে সফল সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে বলে বাসস জানিয়েছে। এটি শুধু নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ঘটনা নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








