
আইজিপির সাম্প্রতিক ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গের বক্তব্য, পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় মতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে কথা বলেছেন মানবাধিকারকর্মী ড. নাবিলা ইদ্রিস। তার মতে, সমস্যার সমাধান শুধু কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে অন্য কাউকে নিয়োগ দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া এবং একই সাথে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। তিনি মনে করেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন, কার্যকর তদন্তব্যবস্থা এবং মতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিতÑ
প্রশ্ন : পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সরকার চাইলে ‘ক্রসফায়ার’ হতে পারেÑ এ ধরনের বক্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আমার কাছে বিষয়টি শুধু একজন আইজিপির ব্যক্তিগত বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আরো বড় একটি প্রশ্ন রয়েছেÑ পুলিশ কি সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী চলবে, নাকি আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে? একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি মনে করেন, সরকার চাইলে আইনবহির্ভূত কাজও করা যেতে পারে, তাহলে সেটি শুধু তার ব্যক্তিগত মনোভাবের বিষয় থাকে না; বরং পুরো ব্যবস্থার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বক্তব্যটির একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে সরকার চাইলে তিনি যেকোনো নির্দেশ পালন করবেন। কিন্তু সবচেয়ে সহানুভূতিশীল ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেও মূল সমস্যার সমাধান হয় না। পুলিশের দায়িত্ব সরকারের যেকোনো নির্দেশ পালন করা নয়; বরং আইন মেনে দায়িত্ব পালন করা।
প্রশ্ন : পুলিশ সদর দফতর বলেছে, বক্তব্যটি রূপক অর্থে দেয়া হয়েছিল। এই ব্যাখ্যা কি বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : সেটি পুলিশ সদর দফতরের ব্যাখ্যা। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্যের কাছে বক্তব্যটি কী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি মনে করেন, সরকারের নির্দেশই শেষ কথা এবং সেই নির্দেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই, তাহলে আইনের শাসনের নীতিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমার মতে, আইজিপির এ ধরনের বক্তব্য দেয়া উচিত হয়নি। বক্তব্যের জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একে শুধু রূপক অর্থে বলা হয়েছেÑ এমন ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো বিষয়টি শেষ করা যায় না। রাষ্ট্রীয় মতা কিভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।
প্রশ্ন : সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরার কথা বলা হয়েছে। আইজিপির বক্তব্য কি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : বক্তব্যটি নিজে কোনো আইন নয়। তাই বক্তব্যটি সরাসরি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কি না, সেটিকে আমি মূল প্রশ্ন হিসেবে দেখছি না। বরং দেখতে হবে, এই বক্তব্য বাস্তবে প্রয়োগ করা হলে কী ঘটতে পারে।
সরকারের নির্দেশে কাউকে আইনবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হলে তা সংবিধান, আইন ও চাকরিবিধির সাথে সাংঘর্ষিক হবে। রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা শুধু সরকারের নির্দেশ পেয়েছেন বলে বেআইনি কাজের দায় থেকে মুক্ত হতে পারেন না। কেউ জেনে শুনে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অংশ নিলে তার ব্যক্তিগত দায়ও তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় মতা প্রয়োগের সাথে আইনের শাসনের সম্পর্কটি এভাবেই বুঝতে হবে।
প্রশ্ন : আইজিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত হতে পারেÑ এমন আলোচনা রয়েছে। আপনি কী মনে করেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : কোনো কর্মকর্তার বক্তব্যের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, সেটি যদি নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। জবাবদিহি কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করার কথা নয়। নিয়ম অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটি স্পষ্ট থাকা উচিত।
একইভাবে, কোনো সংসদ সদস্য বা মতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ উঠলেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতার অবস্থান কারো জন্য আলাদা সুরা তৈরি করতে পারে না। আইনের প্রয়োগ সবার েেত্র সমান হচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন : তাহলে পুলিশ সংস্কারের মূল জায়গাটি কোথায়?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : পুলিশের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি এবং আইজিপি নিয়োগের েেত্র নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে একটি স্বাধীন ও কার্যকর পুলিশ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। পুলিশকে এমন কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে, যেখানে কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এবং বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার কারণে ব্যক্তিগতভাবে তিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকবেন না।
আইনে বলা থাকতে পারে, পুলিশ সদস্য বেআইনি নির্দেশ মানতে বাধ্য নন। কিন্তু বাস্তবে তিনি যদি সেই নির্দেশ অমান্য করার কারণে পদোন্নতি, বদলি কিংবা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে শুধু আইনি নীতি দিয়ে কাজ হবে না। সেই নীতি অনুসরণ করার বাস্তব সুযোগও তৈরি করতে হবে।
এটি প্রণোদনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরার প্রশ্ন। একজন কর্মকর্তা আইন মেনে চলার কারণে তিগ্রস্ত হলে, অথচ বেআইনি নির্দেশ পালন করে পুরস্কৃত হলে, ব্যবস্থা আইনসম্মত আচরণকে উৎসাহিত করছে না। তাই পুলিশকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি এমন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বেআইনি নির্দেশ অমান্য করা তার পেশাগত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে না।
প্রশ্ন : পুলিশ কমিশন গঠনের আলোচনা দীর্ঘদিনের। বাস্তবায়নের পথে বাধা কোথায়?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ স্বাধীন পুলিশ কমিশনের পে ছিলেন। কারণ, পুলিশ সদস্যদেরও এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে তাদের পেশাগত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণত পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে পুলিশকে নিজেদের মতো ব্যবহার করা সহজ হয়। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠিত হলে সেই নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর হাতে চলে যাবে। এ কারণেই রাজনৈতিক অনীহা বড় বাধা হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পুলিশ সংস্কারের মতো বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক বাধার প্রশ্ন উঠেছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত কেন আটকে গেছে, তা মূল্যায়ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও নথি দেখা প্রয়োজন। মূল বিষয় হলো, পুলিশ কমিশন শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রশ্ন নয়; এটি মতা ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো পরিবর্তনের প্রশ্ন।
প্রশ্ন : আপনি কি পুলিশ সংস্কার কমিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : না, আমি পুলিশ সংস্কার কমিশনের সাথে যুক্ত ছিলাম না। মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করেছি। তাই পুলিশ সংস্কার কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে প্রত্য অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে পুলিশকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া এবং একই সাথে জবাবদিহির আওতায় রাখার প্রয়োজনীয়তা মানবাধিকার সুরার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রশ্ন : আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করাই কি যথেষ্ট?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : ব্যক্তি ও ব্যবস্থাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। কেউ অপরাধ করলে তার ব্যক্তিগত দায় থাকবে। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি বারবার ওঠে, একই ধরনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ আসে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও পরীা করা প্রয়োজন।
নিয়োগের পদ্ধতি, দায়িত্ব পালনের কাঠামো, তদারকি, জবাবদিহি এবং অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থাÑ সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। অপরাধ ব্যক্তির হতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সেই অপরাধের পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়ও চিহ্নিত করতে হবে। তা না হলে একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হবে, কিন্তু একই সমস্যা ফিরে আসবে।
প্রশ্ন: র্যাবের নাম পরিবর্তন বা পুনর্গঠনের আলোচনা হচ্ছে। নাম বদলালে কি সংস্কার সম্ভব?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : শুধু নাম পরিবর্তন করলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাল্টানো যেতে পারে, কিন্তু কাজের পদ্ধতি, কমান্ড কাঠামো, তদন্তব্যবস্থা এবং জবাবদিহি যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তন হবে না।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তদন্তের দায়িত্ব যদি শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কমিটির হাতে থাকে এবং বাইরের স্বাধীন তদারকি কার্যকর না হয়, তাহলে নিরপেতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নাম পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কী ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে, তা দেখা।
প্রশ্ন : তাহলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত কী?
ড. নাবিলা ইদ্রিস : আইন মেনে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এবং কার্যকর জবাবদিহিÑ দু’টিই নিশ্চিত করতে হবে। শুধু স্বাধীনতা দিলে হবে না, আবার জবাবদিহির নামে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও চলবে না। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যানের সুরা এবং অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা বদল হলেও তার দায়িত্ব পালনের নীতি বদলে না যায়। ব্যক্তি পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তার পাশাপাশি ব্যবস্থার পরিবর্তনও জরুরি। নইলে একই সঙ্কট বারবার ফিরে আসবে।
(দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল)
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








