
বিশেষ সংবাদদাতা
কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও পল্লী অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সচল রাখতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। তবে নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) শেষে বিতরণ হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার মোটে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গড়হঃযষু জবঢ়ড়ৎঃ ড়হ অমৎরপঁষঃঁৎব ধহফ জঁৎধষ ঋরহধহপব-অঁমঁংঃ ২০২৬ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক দিকে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, অন্য দিকে কৃষিঋণের স্থিতি বৃদ্ধি এবং বিপুল অঙ্কের বকেয়া- এই দুই বিপরীত বাস্তবতাই এখন গ্রামীণ অর্থায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। একই সময়ে গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিস্তার ঘটলেও ১১টি প্রধান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৬৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে প্রকৃত বিতরণ ছিল ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা আগের অর্থবছরের প্রকৃত বিতরণের তুলনায় প্রায় ৪০ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুলাই-আগস্টে কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ছয় হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই বিতরণের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৮২৬ কোটি তিন লাখ টাকা; অর্থাৎ দুই মাসে বিতরণ বেড়েছে ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধির এই হার ইতিবাচক হলেও বার্ষিক লক্ষ্য অর্জনের সমীকরণ বেশ কঠিন। হিসাব অনুযায়ী, বছরের বাকি ১০ মাসে বিতরণ করতে হবে ৫৩ হাজার ১৪২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা; অর্থাৎ আগামী মাসগুলোতে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা বিতরণ করতে হবে, যা প্রথম দুই মাসের মাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। কৃষির মৌসুমি চাহিদা ও ফসলের উৎপাদনচক্র বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
আগস্টে ঋণে বড় উল্লম্ফন ও বেসরকারি ব্যাংকের ভূমিকা
জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে কৃষিঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাইয়ে দুই হাজার ৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা বিতরণ হলেও আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ১৯৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় (এক মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি ৫৭.৯৮%)। মূলত বেসরকারি বাণিজ্যিক ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বরাবরের মতো এবারো বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাঁধেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬১ দশমিক ৫৫ শতাংশ বা ৩৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছয় হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংকের ১৩ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা এবং বিদেশী ব্যাংকের দুই হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।
বাড়ছে ফসল ও প্রাণিসম্পদ, কমছে মৎস্য
কৃষিঋণ বিতরণের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-আগস্টে মোট বিতরণের ৪৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ গেছে ফসল খাতে (আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪৩.৬৭%)। আমন চাষ ও আগাম শীতকালীন ফসলের প্রস্তুতির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই মূলত এই খাতটিতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে।
পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে ঋণের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫৯ শতাংশে (আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৯.৩৩%)। তবে মৎস্য খাতে ১৪.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ১৩.২৩ শতাংশ এবং দারিদ্র্যবিমোচন খাতে ৪.৭৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩৩ শতাংশে নেমেছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, উপখাতগুলোর এই ভারসাম্যহীনতা পর্যালোচনা করা জরুরি।
ঋণ আদায় বাড়লেও স্থবির নয় বকেয়ার চাপ
আগস্টে তফসিলি ব্যাংকগুলো তিন হাজার ৮৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা কৃষিঋণ আদায় করেছে। জুলাই-আগস্ট দুই মাসে মোট আদায় হয়েছে সাত হাজার ৪১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালের আগস্ট শেষে সুদসহ কৃষিঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৬২০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একই সময়ে কৃষিঋণের বকেয়া কমে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৯৩৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা (যা মোট স্থিতিসাপেক্ষে প্রায় ৩৪.৫ শতাংশ)। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর বকেয়া ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিক বকেয়া কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
ক্ষুদ্রঋণ ও পিকেএসএফের কার্যক্রম
গ্রামীণ অর্থায়নে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে জুলাই-আগস্টে মোট ৭৫৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বিতরণ এবং এক হাজার ৪৩৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। আগস্ট শেষে পিকেএসএফের ঋণস্থিতি ছিল ১৬ হাজার ২৭৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যার বিপরীতে বকেয়া ছিল ১১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
অন্য দিকে গ্রামীণ ব্যাংক ও ১০টি বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) সম্মিলিতভাবে আগস্টে ১৮ হাজার ২৮১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে। আগস্ট শেষে এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৯৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৬৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা (মোট স্থিতির ৬.৪০%)। ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের প্রায় ৬৯ শতাংশই গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ও আশার হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ের প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ ও সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণের বকেয়া নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নের স্বার্থে কেবল ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান, সঠিক খাতভিত্তিক ব্যবহার এবং কৃষকদের পরিশোধ সক্ষমতা সমানভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








