মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৬৫৮ ডলার

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলারে। তিন বছর আগে, ২০২২-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, তিন বছরে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১৭.২৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭.৭ শতাংশ।
ঋণের মোট স্থিতি বাড়লেও এর প্রবৃদ্ধিতে লক্ষণীয় মন্থরতা এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.১ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১.২ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন অ্যান্ড এক্সটার্নাল ডেট ম্যানেজমেন্ট-সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্যসূত্রে সঙ্কলিত বৈদেশিক ঋণের সূচকগুলোতে এ সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।
৩ বছরে ঋণ বেড়েছে ১৭.২৯ বিলিয়ন ডলার
দেশের বৈদেশিক ঋণের ধারাবাহিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায় :
 ২০২২-২৩ অর্থবছর : ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ডলার
 ২০২৩-২৪ অর্থবছর : ১০৪.০৭ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ৬.৫%)
 ২০২৪-২৫ অর্থবছর : ১১৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ৯.১%)
 ২০২৫-২৬ অর্থবছর : ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ১.২%)
ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অর্থ এ নয় যে, আগের ঋণের বোঝা বা স্থিতি কমে গেছে; বরং এর অর্থ হলো- নির্দিষ্ট সময়ে নতুন ঋণের সংযোজন আগের বছরের তুলনায় ধীরগতির ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমলেও মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১.৪০ বিলিয়ন ডলার বেশি রয়েছে।
ফলে বৈদেশিক ঋণ মূল্যায়নে কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং ঋণের মোট স্থিতি, পরিশোধের সময়সূচি এবং নতুন ঋণের অর্থনৈতিক সুফল- সবকিছুই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাড়ছে, কমছে স্বল্পমেয়াদি ঋণ
বৈদেশিক ঋণের কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আধিক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।
 দীর্ঘমেয়াদি ঋণ : ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৮১.৬৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১০০.৬৪ বিলিয়ন ডলারে। তিন বছরে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ১৮.৯৬ বিলিয়ন ডলার। মোট ঋণের অনুপাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অংশ ৮৩.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭.৫০ শতাংশে।
 স্বল্পমেয়াদি ঋণ : একই সময়ে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ১৬.০১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। মোট ঋণে এর অংশ ১৬.৪০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১২.৫০ শতাংশ।
সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিশোধের সময়সীমা বেশি থাকায় তা তাৎক্ষণিক তারল্য সঙ্কট কমায়। তবে সুদের হার, মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপর এর প্রকৃত বোঝা নির্ভর করে।
জিডিপির অনুপাতে বৈদেশিক ঋণ কমেছে
অর্থনীতির আকারের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের অবস্থান কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে।
 জিডিপি অনুপাত : ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ২১.৬০ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩.১০ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.৯১ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২২.৯৫ শতাংশে (১.৯৬ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস)।
আপাতদৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক মনে হলেও, এটি মূলত জিডিপির নামমাত্র প্রবৃদ্ধি ও বিনিময় হারের প্রভাবে ঘটেছে। এটি সরাসরি সরকারের হাতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না।
সরকারি খাতের ঋণই মোট বৈদেশিক ঋণের প্রধান অংশ
মোট বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগই এখন সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে।
 সরকারি খাত : মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি খাতের অংশ ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৭৭.২০ শতাংশ থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৮২.৭০ শতাংশে। জিডিপির অনুপাতে এ হার ১৮.৯৮ শতাংশ।
বেসরকারি খাত : বিপরীতে, বেসরকারি খাতের অংশ ২২.৮০ শতাংশ থেকে কমে ১৭.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে (জিডিপির অনুপাতে ৩.৯৭ শতাংশ)।
সরকারি খাতের এ বিপুল ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলোর উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান বা রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সক্ষমতা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
রিজার্ভের তুলনায় ঋণের চাপ কতটা?
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়:
মোট বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৩৯৪.৭১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩৪৯.৪২ শতাংশে।
স্বল্পমেয়াদি ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাতও ৬৪.৭০ শতাংশ থেকে কমে ৪৩.৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।
রিজার্ভের এ অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, মোট বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার কুশন বা সুরক্ষাবলয় আগের তুলনায় কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছে। আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি নির্ধারিত ঋণ পরিশোধের সময়সূচি মাথায় রেখে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫৫৮ ডলারে
জনসংখ্যার অনুপাতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর বৈদেশিক ঋণের গড় পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে:                                                     
২০২২-২৩ : ৫৭১.৮৩ ডলার
২০২৩-২৪ : ৬০৬.৫০ ডলার
২০২৪-২৫ : ৬৫৩.০৮ ডলার
২০২৫-২৬ : ৬৫৭.৭৬ ডলার
তিন বছরে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮৫.৯৩ ডলার বা প্রায় ১৫ শতাংশ। তবে এটি কোনো ব্যক্তিগত দেনা নয়, বরং মোট বৈদেশিক ঋণের জনমিতিক গড় হিসাব। এ ঋণের বিপরীতে নির্মিত অবকাঠামো বা সেবা থেকে অর্থনীতি যথাযথ সুফল পাচ্ছে কি না, সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয়।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় সামনে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই রাখতে এখন পাঁচটি বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেয়া প্রয়োজন :
১. প্রকল্পের উৎপাদনশীলতা : নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রফতাানি আয় বাড়ায় কিংবা আমদানি বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে।
২. নগদ প্রবাহের সামঞ্জস্য : রফতানি আয়, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রক্ষেপণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারণ করা।
৩. সরকারি ও বেসরকারি খাতের পৃথক মূল্যায়ন : সরকারি খাতের বাজেটের ওপর চাপ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আলাদাভাবে তদারকি করা।
৪. বাস্তবায়ন দক্ষতা : প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধ করা, যাতে ঋণের অর্থ যথাযথ অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে পারে।
৫. স্বচ্ছতা ও ডেটা প্রকাশ : ঋণের সুদের হার, মুদ্রার ধরন, সরকারি গ্যারান্টি এবং বার্ষিক পরিশোধের বাধ্যবাধকতার তথ্য আরোও স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করা।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের সর্বশেষ পরিসংখ্যান একটি মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। এক দিকে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ১.২ শতাংশে নামা এবং জিডিপি অনুপাত হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। অন্য দিকে, মোট স্থিতি ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো, মাথাপিছু ঋণ ৬৫৮ ডলারে উন্নীত হওয়া এবং রিজার্ভের অনুপাত কিছুটা কমে যাওয়ার বিষয়টি সতর্কবার্তা দেয়।
ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাবিকাঠি কেবল কম ঋণ নেয়ার মধ্যে নয়, বরং সংগৃহীত ঋণের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল ব্যবহার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি পোক্ত করার ওপর নির্ভর করছে।