
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবস পার করল দেশের পুঁজিবাজারগুলো। আর এই কর্মদিবসের সব ক’টিই পার হয়েছে সূচকের অবনতি দিয়ে। টানা এ দরপতনে ফের বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন বিনিয়োগকারীরা। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বাজারগুলোতে প্রতিদিন যে বিক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে তার কারণ খতিয়ে দেখার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের সাথে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা এ প্রতিক্রিয়া জানান। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, পুঁজিবাজারে সূচকের উন্নতি অবনতি থাকতেই পারে। কিন্তু দিনের পর দিন এভাবে টানা পতন কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ বলে মেনে নেয়া যায় না। কারা বাজারে প্রতিদিন বিক্রয়চাপ তৈরি করছে বা এর পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আছে কি না বা কারা কোন উদ্দেশ্যে এটা করছে তা খুঁজে বের করা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক সময়ের বাজার আচরণে হতাশায় আক্রান্ত বিনিয়োগকারীরা আরো বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করা হলে পুঁজিবাজার নতুন করে গতি ফিরে পায়। কিন্তু কয় মাস যেতে না যেতেই আবারো ধারাবাহিক পতনের ফাঁদে আটকা পড়ে বাজারগুলো। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলো পুঁজিবাজারের সংস্কার ও এর বিভিন্ন আইনি কাঠামো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এটা ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রতিদিনের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের করণীয় কিছু নেই।
ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১২ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে। অথচ দিনের শুরুতে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ২২ পয়েন্টের বেশি। কিন্তু লেনদেন শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় শুরু হয় বিক্রয়চাপ। টানা বিক্রয়চাপের ফলে বেলা সোয়া ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে পাঁচ হাজার ৩৭৯ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির অবনতি রেকর্ড করা হয় ২০ পয়েন্টের বেশি। তবে লেনদেনের শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপ কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠলে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পায় ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর পতন ঘটে যথাক্রমে ২ দশমিক ৮৩ ও ৬ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) পতনের মাত্রা ছিল আরো বেশি। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৫৭ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৪ হাজার ৫৫৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে স্থির হয় ১৪ হাজার ৫০০ দশমিক ৮০ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪৩ দশমিক ৮১ ও ২৩ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট।
এদিকে বেশ কয়েকটি কোম্পানির লভ্যাংশ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার পরও চলমান বাজার পরিস্থিতির কারণে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের খুব একটা সাড়া পায়নি। গতকাল তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও একমি ল্যাবরেটরিজ বিগত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যথাক্রমে ১৩০ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। দু’টি কোম্পানির এ লভ্যাংশ ঘোষণার হার ছিল অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও গতকালের বাজারে কোম্পানি দু’টির শেয়ারদরে খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। স্কয়ার ফার্মা লেনদেন শেষ করে আগের দিনের দরেই। অথচ গত অর্থবছরে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৩১ দশমিক ২৪ টাকা যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ২৭ দশমিক ০৪ টাকা। অপরদিকে, ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা একমি ল্যাবরেটরিজের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ টাকা যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১১ দশমিক ৪৮ টাকা। সোমবার কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ৭৭ দশমিক ১০ টাকায় লেনদেন শেষ করে। গতকাল একমির সর্বশেষ লেনদেন ছিল ৭৭ দশমিক ৫০ টাকা।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাজার আচরণ নেতিবাচক থাকলে যতই ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করুক তার কোনো প্রভাব থাকে না বাজারে। কারণ হিসাবে তারা মনে করেন, বাজার ভালো থাকলে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই অন্য শেয়ার বিক্রি করে ভালো লভ্যাংশ দেয়া শেয়ার কেনেন। কিন্তু বাজার খারাপ হলে কেউ চাইলেও এক কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে অন্য কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারেন না। কারণ এ পর্যায়ে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করলেই গুনতে হয় বড় লোকসান। তবে তাদের মতে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেসব কোম্পানিকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত যেগুলো সবসময় বিনিয়োগকারীদের ভালো লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করলে মন্দা বাজারে সাময়িকভাবে দরপতন ঘটলেও ঘোষিত লভ্যাংশ দিয়ে তার অনেকটা পুষিয়ে নেয়া যায়।
গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি কোম্পানি শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানিটি গতকাল বিগত অর্থবছরের জন্য ৪০ শতাংশ ঘোষণা করে। আগের বছর একই সময়ে কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার ছিল ২০ শতাংশ। মূল্যস্তর বিবেচনায় ঘোষিত লভ্যাংশ অনেক ভালো হওয়ায় গতকাল লেনদেনে এগিয়ে ছিল কোম্পানিটি। ১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ৩১ লাখ ৪৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ১৩ কোটি ১৮ লাখ টাকায় ৪৪ লাখ ছয় হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রাইম ব্যাংক। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, মালেক স্পিনিং, ব্র্যাক ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








