যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের প্রভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনে আকুল জেন-জি

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

খোদ যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন জি’ এখন এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আকাশচুম্বী আবাসন খরচ, শিক্ষাঋণ ও নিত্যদিনের চড়া ব্যয়ের কারণে তাদের কাঁধে  ঋণের পাহাড় জমছে। ‘পরিশ্রম করলেই সাফল্য আসে’- আমেরিকান ড্রিমের এই চিরাচরিত প্রতিশ্রুতি আজ তাদের কাছে ফিকে হয়ে গেছে। আর এই আর্থিক হতাশা ও বঞ্চনার বোধই সরাসরি প্রভাব ফেলছে তাদের রাজনৈতিক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণরা অনেক বেশি আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ট্রান্সইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৪ বছর বয়সী জেন জি সদস্যরা আগের প্রজন্মের সমবয়সীদের তুলনায় অনেক বেশি ক্রেডিট কার্ড, অটো-লোন ও ব্যক্তিগত ঋণের দায়ে জর্জরিত।
কলেজ জীবন শেষে শিক্ষার্থীদের পিছু নেয় ৩০ হাজার ডলারেরও বেশি ছাত্রঋণ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের কারণেও অনেকে নতুন করে ঋণের মুখে পড়ছেন। মিলিজিয়ালদের তুলনায় জেন জি প্রজন্মের তরুণরা (২২ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা) অনেক বেশি ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি ঋণ ও ব্যক্তিগত ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। সুপ্রিম কোর্ট ঋণ মওকুফ পরিকল্পনা বাতিল করায় এবং সরকার থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা না পাওয়ায় এই সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
পিতামাতার স্বাস্থ্যবীমার বয়সসীমা পার হওয়ার পর তরুণদের নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা খরচ বহন করতে হয়। কংগ্রেসের মাধ্যমে এসিএ বা সাশ্রয়ী মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত ট্যাক্স ক্রেডিটগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রিমিয়াম বা বীমার খরচ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন চিকিৎসা বিল পরিশোধের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হন।
জীবনযাত্রার সঙ্কট
গ্যাস কেনা বা বাড়িভাড়া দেয়ার মতো সাধারণ খরচ মেটাতেও তরুণদের ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবাসন সঙ্কটের কারণে তারা বাধ্য হয়ে সুবিধাজনক নয় এমন এলাকায় চড়া দামে বসবাস করছে। আকাশছোঁয়া ভাড়ার কারণে তরুণরা কম নিরাপদ অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ সামান্য ভালো জায়গায় স্থানান্তরিত হতে গেলে মাসে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ ডলার খরচ করতে হয়। গ্যাস, খাদ্য ও সাধারণ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রথমবার ক্রেডিট কার্ডের ঋণ জমা করছেন।
চাকরির বাজারে মন্দা
তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ (২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৮%, যেখানে জাতীয় গড় ৪.২%)। ২০২৩ সাল থেকে এন্ট্রি-লেভেল চাকরির সুযোগ প্রায় ৩৫% কমে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের ক্ষেত্রকে বদলে দিচ্ছে, আর ইন্টার্নশিপের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করা অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ঋণের চাপ তরুণদের মানসিকতায় গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউসিএলএ জরিপ অনুযায়ী, ৮৬% তরুণ আমেরিকান স্বপ্নের কোনো না কোনো সংস্করণ অর্জন করতে চায়, কিন্তু ৬০% তরুণই মনে করে যে ব্যক্তিগতভাবে তাদের জন্য এটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এই ব্যবধান তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
যখন প্রথাগত উপায়ে বাড়ি কেনা বা স্থায়ী হওয়া অসম্ভব মনে হয়, তখন তরুণদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের এক অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে তারা খেলাধুলার ওপর বেটিং এবং ভবিষ্যদ্বাণী বাজার বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ফটকা বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা তাদের ঋণগ্রস্ততাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সোস্যাল মিডিয়ায় ‘ডুম স্ক্রোলিং’ তরুণদের মধ্যে অর্থনৈতিক ভীতি ও হতাণাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। তারা প্রতিনিয়ত এমন তথ্যের বৃত্তে থাকে যা তাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিস্থিতি কতটা খারাপ।
রাজনৈতিক মোহভঙ্গ
ঐতিহ্যগত উপায়ে সফল হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তরুণদের মধ্যে একধরনের ‘আর্থিক নিহিলিজম’ বা নৈরাজ্যবাদী মানসিকতা সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের আশা ছেড়ে অনেকেই এখন স্পোর্টস বেটিং বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
তীব্র অনাস্থা
বর্তমান সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। ফেডারেল সরকারের ওপর আস্থা মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ভোটদানে অনীহা বনাম উগ্রপন্থার আকর্ষণ দেখে অনেকে হতবাক। অনেকে মনে করেন ভোট দিয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না, ফলে তারা নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়ছেন। অন্য দিকে কেউ কেউ এই চরম হতাশা থেকে উগ্র বা চরমপন্থী মতাদর্শের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। ব্যবস্থার প্রতি চরম হতাশা ও ক্ষোভ অনেক সময় তরুণদের উগ্র বা চরমপন্থী ধারার দিকে ঠেলে দিচ্ছে- ডানপন্থী বা বামপন্থী উগ্র রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ কিংবা করপোরেট অন্যায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার অনলাইন রোমান্টিকীকরণ তারই লক্ষণ। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, বিকল্পহীনতার বোধ তরুণদের মধ্যে চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরীক্ষা
২০২৪ সালের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও, কোনো দলই এখনো তাদের স্থায়ী আনুগত্য অর্জন করতে পারেনি। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তরুণদের এই ক্ষোভ বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
উভয় দলের তরুণ প্রার্থীরা (যেমন রিপাবলিকান রিলে ওয়েন্স বা ডেমোক্র্যাট জাস্টিন পিয়ারসন) বুঝতে পেরেছেন যে ফাঁকা বুলি দিয়ে তরুণদের মন জয় করা যাবে না। আবাসন সঙ্কট দূর করা, মজুরি বৃদ্ধি এবং ছাত্র ও চিকিৎসা ঋণ কমানোর মতো বাস্তবমুখী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
জেন জি প্রজন্ম আজ কেবল নিজেদের টিকে থাকার লড়াই করছে না, তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রাজনীতিবিদরা যদি তরুণদের এই অর্থনৈতিক সঙ্কট সমাধানে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন, তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি এই অনাস্থা এবং হতাশা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে আরো বেশি অনিশ্চিত করে তুলবে।
বর্তমান সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। মাত্র ১৫% তরুণ ফেডারেল সরকারকে ভরসা করে এবং ৫০% তরুণ মনে করে যে সরকারের সিদ্ধান্তে তাদের কোনো হাত নেই। এর ফলে মিডটার্ম নির্বাচনে তরুণদের ভোটদান বা ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে (মাত্র ৩৩% তরুণ নিশ্চিতভাবে ভোট দেয়ার কথা বলছে)।
জেন জি ভোটাররা দীর্ঘমেয়াদে কোনো নির্দিষ্ট দলের অনুগত নয়। অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে তারা যেকোনো দলকে প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা করে না। তবে একই সাথে যারা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যা (যেমন আবাসন সঙ্কট, মজুরি বৃদ্ধি বা ঋণের চাপ) নিয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধান ও পরিবর্তনের কথা বলছেন (যেমন নতুন প্রজন্মের প্রার্থী রিলে ওয়েনস, জাস্টিন পিয়ারসন বা জোহরান মামদানির মতো নেতারা), তাদের প্রতি তরুণদের একটি অংশ আশাবাদী হয়ে উঠছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, জেন জি প্রজন্মের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল কোনো সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড বা বাহ্যিক কারণে তৈরি হচ্ছে না; বরং তাদের টিকে থাকার লড়াই এবং মৌলিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জনে ব্যর্থতাই তাদের রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করছে।