
নিজস্ব প্রতিবেদক
মেধাবী ও সৎ মানুষ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যত বেশি প্রবেশ করবে, সমাজ তত বেশি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। মেধা ও চরিত্র উপেক্ষিত হলে সমাজ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশ এমনই এক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশপ্রেমিক, সৎ ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তুলতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অন্য দিকে ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ১৪তম হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড ও কুরআন উৎসব-২০২৬-এর প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এবং তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এহসানুল হক মিলন এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, অবজ্ঞা ও ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারি আলিয়া মাদরাসাগুলো ভুতুড়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। শিক্ষার সিলেবাস সংকুচিত করা হয়েছে। এখন আবার কৌশলে মাদরাসাগুলোকে স্কুলে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা মাদরাসার অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে উপস্থাপন করেন, তারাই আবার মাদরাসা শিক্ষার নীতিনির্ধারণের সময় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।
জামায়াত আমির বলেন, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এখন শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা সিভিল প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন হিফজ করতে অসাধারণ স্মরণশক্তি ও মেধার প্রয়োজন হয়। অনেক অভিভাবক সন্তানদের হিফজ শিক্ষায় পাঠালেও সবাই পুরো কুরআন মুখস্থ করতে পারে না। যারা সফলভাবে হিফজ সম্পন্ন করেন, তারা পরবর্তী সময়ে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।
মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আখলাক ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দেয়া হয়। ফলে তারা মেধা অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহভীরু ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পান। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে অবহেলা করছেন, তারা সমাজকে সুন্দর করার পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চান, যেখানে শিক্ষিত হয়েও মানুষ লুটপাট, চুরি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি অভিযোগ করেন, একশ্রেণীর মানুষ নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেশে দেশপ্রেমের কথা বলেন। অথচ তারা দেশকে নিজেদের আয়-রোজগারের ক্ষেত্র এবং দেশের মানুষকে প্রজা হিসেবে বিবেচনা করেন। এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তনে কুরআনের শিক্ষা, চর্চা ও শাসনের প্রয়োজন রয়েছে।
তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে জামায়াত আমির বলেন, প্রতিষ্ঠানটির দেশব্যাপী প্রায় ১২৫টি শাখা রয়েছে। এসব শাখার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে শুধু শাখা বাড়ালেই হবে না, শিক্ষার মানোন্নয়নও অব্যাহত রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে এক হাজার ৭৬১ জন হাফেজ ও হাফেজার অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে কুরআনের হাফেজদের পাশাপাশি হাফেজাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। একজন মা কুরআনের আলোয় আলোকিত হলে তাঁর মাধ্যমে পুরো পরিবার আলোকিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সোমবার একই অনুষ্ঠানের তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সমাজে অবক্ষয় বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা মক্তবে গিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত হয়েছেন। তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন আধুনিক শিক্ষা, আরবি শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
তিনি বলেন, স্কুলে ৫০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষা ও ভাইভা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা বখাটে হবে না। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া আগামী বাংলাদেশের কোনো উপায় নেই। এ শিক্ষা ছাড়া কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। বর্তমানে মাদরাসা ও স্কুলের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। মাদরাসায় যেমন বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগ রয়েছে, তেমনি স্কুলেও এসব বিভাগ রয়েছে। এ সময় তানযীমুল উম্মাহকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী সেলিম উদ্দিন বলেন, কুরআনের হাফেজদের পুরস্কৃত করার আয়োজন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠানগুলোর একটি। কোরআনের আলোকে নিজেদের গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেয রাশেদুল ইসলাম বলেন, কুরআনকে বোঝা ও জানার ক্ষেত্রে তানযীমুল কুরআন অনন্য ভূমিকা রাখছে।
মুফতি আলী হাসান ওসামা বলেন, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি ও সৈনিক-দুজনেরই ভূমিকা রয়েছে। তবে সেনাপতির ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াত মনোনীত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হাফিজুর রহমান বলেন, তানযীমুল উম্মাহ নতুনভাবে ইসলামী সভ্যতাকে জাগ্রত করবে।
অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা শাহজাহান আল-মাদানী। দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যাপক মুফতি ড. আবু ইউছুফ খান। তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাফেজ ড. এ বি এম হিযবুল্লাহ, অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ কামালুদ্দিন আবদুল্লাহ জাফরি, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, উত্তর বাড্ডা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. আনোয়ার হোসাইন মোল্লা, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান, আল-কুরআন একাডেমি লন্ডনের চেয়ারম্যান হাফেজ মুনীর উদ্দিন আহমদ, আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. সামসুল আলম, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এবং অন্যান্য বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও অতিথিরা।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে মারকাযুত তাহফিয ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার চেয়ারম্যান হাফেজ নেছার আহমেদ আন নাছিরী, হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ আবদুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক হারুনুর রশিদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কারী গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শাহ ওয়ালীউল্লাহ, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, শিক্ষাবিদ ড. হাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ ওলীউর রহমান চিশতি, ড. মীম আতিকুল্লাহ, সিনিয়র ডিরেক্টর আ ন মু রাশিদুল ইসলাম সায়েম, মুহা. আসলাম মিয়া, ডিরেক্টর মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ আল-আমিন, আ খ ম মাসুম বিল্লাহ, এইচ এম আবদুল্লাহ আল মামুন, মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস, নুরুল আবছার ভূঁইয়া, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব: আব্দুল্লাহিল আজমী, এম এম রবিউল ইসলাম ও মো: সাইয়েদুর রহমানসহ ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল, শাখাপ্রধান, শিক্ষক, সাংবাদিক, অভিভাবক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিভিন্ন শাখার এক হাজার ৭৫৯ জন হাফেজ শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট, সনদ, পাগড়ি বা স্কার্ফ এবং অ্যাওয়ার্ড ব্যাগ দেয়া হয়। একই সাথে তাদের পিতা-মাতাকেও বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, ইসলামী সংগীত, আলোচনা ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








