
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার জন্য সরকার এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত সাইবার আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তা আবার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠিয়েছেন। জনপরামর্শের মাধ্যমে আইনটি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার সেই পথ ধরেই এগোচ্ছে।
গতকাল রোববার নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পত্রিকাটির কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে সব সময় একধরনের উদ্বেগ কাজ করে। তারা আশঙ্কা করেন, সরকার কোনো আইন বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করে কিনা। গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়েও তাদের মধ্যে শঙ্কা থাকে। তবে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার জন্য সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। প্রস্তাবিত সাইবার আইনের ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আইনটির খসড়া আবার পর্যালোচনার জন্য জনপরামর্শের উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকার সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সামনে এগোচ্ছে।
নয়া দিগন্তের ২২ বছরের পথচলার প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, আজ আনন্দের দিন। তিনি আনন্দ নিয়েই অনুষ্ঠানে এসেছেন। তার বিশ্বাস, নয়া দিগন্ত সত্যের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতা ও হলুদ সাংবাদিকতার পথ পরিহার করে নয়া দিগন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক। আগামী প্রজন্মও পত্রিকাটির প্রতি এই আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকতে হবে। একই সাথে কোনো নাগরিক যেন অপসাংবাদিকতার শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। আইনমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমকর্মীরা প্রায়ই আশঙ্কা করেন, কোনো আইন বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তাদের কাজের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করবে কি না। এই উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করেও ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ করা হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে। কিভাবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নাগরিকের অধিকার একসাথে রক্ষা করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের বক্তব্যের মানদণ্ড ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। একই সাথে নাগরিকের অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সঠিক পথ দেখাতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নাগরিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং দু’টিই সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোনো নাগরিক যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেউ অপসাংবাদিকতার শিকার হোক, তা নিশ্চয়ই কেউ চান না। তিনি বলেন, কোনো নাগরিক যখন অপসাংবাদিকতার শিকার হন, তখন সাংবাদিক সমাজ সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকেরাও কষ্ট পান। কারণ, কিছু মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর এসে পড়তে পারে।
নিজের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় কোনো আইনজীবী খারাপ কাজে জড়ালে তারও খারাপ লাগত। কারণ, একজন আইনজীবীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো আইনজীবী সমাজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, অপসাংবাদিকতা শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না, সাংবাদিক সমাজের মর্যাদাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। এ কারণে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্বশীলতাও বজায় রাখতে হবে।
সংবাদপত্র ও সরকারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সাধারণভাবে বলা হয়, সরকার সংবাদপত্রকে প্রভাবিত করে। আবার সংবাদপত্রের দ্বারাও সরকার প্রভাবিত হয়। তবে তার বক্তব্য, সংবাদপত্রের দ্বারাই সরকার প্রভাবিত হয়, সরকার সংবাদপত্রকে প্রভাবিত করতে পারে না। তিনি বলেন, সংবাদপত্রের সংবাদ ও বক্তব্য সরকারকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাবিত করে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে উঠে আসা বিষয়গুলো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতি নিজের ইতিবাচক মনোভাবও তুলে ধরেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী একটি আনন্দের উপলক্ষ। তিনি ভেবেছিলেন, অনুষ্ঠানে এসে একটু কেক খাবেন কিংবা চা পান করে চলে যাবেন। কিন্তু তাকে বক্তব্য দিতে হবে, তা ভাবেননি। নয়া দিগন্তের স্লোগান ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পত্রিকাটি গত ২২ বছর ধরে কাজ, কথা ও কর্মের মধ্য দিয়ে এই আদর্শ অনুসরণ করেছে। এর পেছনে রয়েছে প্রজ্ঞা, মেধা, শ্রম ও ঘাম।
তিনি বলেন, নয়া দিগন্ত এখন ২২ বছরের তরুণ। এই যৌবনে পত্রিকাটি আরো সামনে এগিয়ে যাক। বর্তমান অবস্থান থেকে আরো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এমন অগ্রগতি অর্জন করতে হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানটির অবনতি না ঘটে। নয়া দিগন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আইনমন্ত্রী বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকলে সেটিকে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি আশা করেন, নয়া দিগন্ত একদিন শতায়ু হবে।
নতুন প্রজন্মের হাত ধরে পত্রিকাটি এগিয়ে যাবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোনা একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পৃথিবী আমাদের এবং নতুন প্রজন্মের সবার। তবে শেষ পর্যন্ত পৃথিবী নতুন প্রজন্মেরই। কারণ, একসময় বর্তমান প্রজন্মকে বিদায় নিতে হবে। তখন নতুন প্রজন্মই পৃথিবীর দায়িত্ব নেবে।
একইভাবে নয়া দিগন্তও নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অতীতে পত্রিকাটি যেভাবে সত্যের পথ অনুসরণ করেছে, ভবিষ্যতেও একই স্লোগান ও আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নয়া দিগন্তের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। নতুন প্রজন্ম পত্রিকাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে সত্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাক। এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








