বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে জামায়াত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: ডা. শফিকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

বৈষম্যহীন, ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক ও যুবসমাজের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আগামীর মুক্ত, বৈষম্যহীন, ন্যায়-ইনসাফ ও আমাদের যুবসমাজের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পর ২০২৪ সালে জুলাইয়ে এ দেশে জুলাই বিপ্লব হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়নের জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। কমিশনে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দলগুলো ছিল। দীর্ঘ সাত মাসের অধিক সময় আলোচনা করে বেশির ভাগ বিষয়ে একমত হয়ে একটি সনদ তৈরি হয়। এই সনদটা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সবার ছিল। এরই ভিত্তিতে অংশীজনেরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে ২৫ সালে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে একই দিনে দু’টি ভোট হয়েছে। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরেকটি গণভোট। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল আগে গণভোট হবে পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আমাদের আশঙ্কা ছিল দু’টি একসাথে করা হলে গুলিয়ে ফেলা হবে। আমাদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। তারা শুরু থেকে চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে। বিএনপির দাবি ছিল একই দিনে হোক। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে একই দিনে দু’টি ভোট দিলেন।
তিনি বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একবার হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইলেন। কিন্তু জনগণ জানে ও বলে বিএনপি আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি। দেশে-বিদেশে নিজেদের লোকদের নির্দেশনা দিয়েছিল ‘না’ ভোট দেয়ার জন্য। জনগণের আকাক্সক্ষার কাছে না ভেস্তে গেছে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছে- আমরা অতীতের বস্তাপচা ঘুণে ধরা রাজনীতি এ দেশে আর দেখতে চাই না। আমরা তার পরিবর্তন চাই, সংস্কার চাই, আর আমাদের সন্তানেরা এ জন্য জীবন দিয়েছে। জামায়াত আমির বলেন, আমাদের সন্তানেরা বলেছিল আমরা বৈষম্যের বাংলাদেশ দেখতে চাই না, উই ওয়ান্ট জাস্টিস। কিন্তু জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বৈষম্য আরো বেড়েছে। এখন বিএনপি সংবিধান খোঁজে কেন? সাড়ে ১৫ বছর তো সংবিধান মেনে মিছিল করে ফ্যাসিবাদ আপনারাও তাড়াতে পারেননি, আমরাও পারিনি। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও ৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন হতো না। ওই নির্বাচন না হলে বিএনপি সরকার হয় কিভাবে আর আমরা বিরোধী দল হই কিভাবে? এই সংবিধানের নেশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এ সংবিধান শুধু ফ্যাসিবাদের জন্মই দেয়নি, স্থায়ী রূপ দিয়েছিল। সংবিধানের যেসব জায়গায় আমূল পরিবর্তন দরকার সেখানে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে। তারা যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট দেয়নি এখন সেগুলোও এড়িয়ে চলছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইতোমধ্যে বহুবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। কিন্তু আদালতে গিয়ে সেটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমরা ওই প্রক্রিয়ায় যেতে চাই না। আমরা পণ্ডশ্রম করব না এবং অতীতের ভুল ধারায় চলতে অভ্যস্ত নই, রাজি নই- এজন্যই আমরা সংস্কার চাই। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অস্ত্র ও মাদক আসে তা কেন বিএনপি ঠেকাতে পারে না। অনাকাক্সিক্ষত বিষয়গুলো যে সরকারের ঠেকানোর ক্ষমতা নাই, সেই সরকারের দেশ শাসনের কোনো অধিকার নাই। আবালবৃদ্ধবনিতার উপর করের বোঝা, দুর্নীতির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে বিএনপি। মানুষের জীবন এখন অতিষ্ঠ। প্রবাসে অস্থিরতার কারণে প্রবাসীরা ফেরত আসছেন। তাদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশের মানুষকে স্বস্তি দেয়ার পরিকল্পনা নাই। চাঁদাবাজির জ্বালায় অতিষ্ঠ জনগণ।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন নিজের মন্ত্রণালয় দেখার সুযোগ না পেলেও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সব মন্ত্রণালয় দেখার যোগ্যতা রাখেন। তার নিজ দলীয় সংসদ সদস্য বলেছেন, মাদক বন্ধ হচ্ছে না, কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আসে। সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে ধোঁকা না দিয়ে নিজের দায়িত্বের প্রতি মনোযোগ দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের বার্তা স্পষ্ট- আমরা আমাদের দলীয় কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামিনি। আমরা নেমেছি জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে। প্রত্যেকটি দাবি জনগণের অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত। এই দাবি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসতে বিভিন্ন কায়দায় চাপ দেয়া হচ্ছে। আমরা জানি, জন্ম যখন নিয়েছি, মৃত্যু আমাদের সাথী। কিন্তু অপমানের মৃত্যুবরণ করতে চাই না। আমাদের নেতৃবৃন্দ কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি, আমরাও করব না।
উপযুক্ত লাঞ্চ খেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় দেশ চালাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ বলেনি আপনি ১৫০ টাকায় লাঞ্চ করেন। বরং জনগণের মুখে দুমুঠো ভাত স্বস্তিতে তুলে দেন। শান্তিতে থাকতে দেন। 
 তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী ৩১ তারিখের লংমার্চকে ঘিরে কোনো ষড়যন্ত্র করবেন না। যদি কোনো ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আমাদের যৌথ লংমার্চের কাফেলা যেভাবে সবকিছু মোকাবেলা করে চট্টগ্রাম গিয়েছিল; এবারো আমরা জনগণের জন্য একইভাবে গন্তব্যে পৌঁছাব, কোনো বাধা আমাদের আটকাতে পারবে না। 
এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলের সাথে সঙ্ঘাতের পথ পরিহার করতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং জনগণের স্বার্থে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। 
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাদের দল শুরুতে এ বিষয়ে জোর দিয়েছিল। বর্তমানে সনদে স্বাক্ষর ও গণভোট সম্পন্ন হওয়ার পরও সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা সেই আশঙ্কাকে আরো স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদের স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সভাপতিত্বের মতো বিষয়ে বিএনপির আপত্তি না থাকা সত্ত্বেও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। এতে সরকারের সংস্কার-প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ প্রণয়ন, স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের পক্ষে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে। এখন পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থান, জুলাই সনদে স্বাক্ষর এবং গণভোটের মাধ্যমে যেসব রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে বিতর্কিত করা উচিত নয়। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। তাই জনগণের রায় উপেক্ষা না করে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক বলেন, জুলাইয়ে এত রক্ত দিয়েও জাতি মুক্তি পায়নি। আওয়ামী লীগ যেভাবে দেশ পরিচালনা করেছে একইভাবে বিএনপিও দেশ পরিচালনা করছে। বিএনপি এখনো সেই ২০০১ সালের অবস্থানে রয়েছে। তারা সময়ের সাথে-সাথে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি। এই অপরিবর্তনের কারণে আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিকেও পালাতে হতে পারে। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে বিএনপি জাতির সাথে যেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এর ফলাফল বিএনপির জন্য শুভ হবে না। 
নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ হাসান নাসির বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। জনগণের সাথে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিএনপি জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে।  
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে সরকার মূলত মাঠপর্যায়ে বার্তা দিয়েছে দুর্নীতি চালিয়ে যাও! যেই বিএনপি দুর্নীতি আর দলীয়করণে ব্যস্ত সেই বিএনপি কখনোই রাষ্ট্র সংস্কার করবে না। আর এজন্যই বিএনপি গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।  
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ড. মো: রেজাউল করিম। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ বীরবিক্রম; এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি; জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি,  সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার;  জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি ও মোবারক হোসাইন; ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি; ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন; শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান; শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি; সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির ও আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির;  ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ব্যক্তি ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।