সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসঙ্কট, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ঘাটতি, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ, শিক্ষক নিয়োগ, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষকসঙ্কট, সরকারি কলেজে প্রভাষক পদ শূন্য,

 

Advertisement

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসঙ্কট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- প্রায় সব স্তরেই প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। কোথাও বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক সঙ্কট। আবার কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণীতে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ ও  ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকসঙ্কটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ খালি রয়েছে। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক তদারকি ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে সীমিত জনবলকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগও ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকস্বল্পতা থাকলে শিক্ষার্থীদের পৃথক শ্রেণীতে প্রয়োজনীয় সময় দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষায় সঙ্কটের ধরন আরো জটিল। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শত শত প্রধান শিক্ষক এবং হাজার হাজার সহকারী শিক্ষকের পদ খালি ছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই হাজার ৮৪২টি শিক্ষক পদ শূন্য থাকার কথা জানানো হয়।
তবে সরকারি বিদ্যালয়ের বাইরেও বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসঙ্কট বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশের ২০ হাজার ৬৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের মাধ্যমিক শাখায় প্রায় ৯০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিন হাজার ৮৬১টিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), দুই হাজার ৭৪৪টিতে গণিত এবং দুই হাজার ৬২৫টিতে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই।
একইসাথে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকসঙ্কটের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে মোট ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। একইসাথে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে প্রধান ও সহকারী প্রধানের পদেও শূন্যতা রয়েছে। এর আগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সপ্তম বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ৮৭টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১৮ হাজার ৩৯৯টি। শেষ পর্যন্ত যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ১১ হাজার ৭১৩ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা সম্ভব হয়।
সূত্র জানায় উচ্চমাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়েও শিক্ষকস্বল্পতা শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তি তৈরি করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৬৫৬টি প্রভাষক পদ এবং সদ্য সরকারিকৃত কলেজগুলোতে দুই হাজার ৪১০টি নন-ক্যাডার প্রভাষক পদ শূন্য থাকার কথা জানানো হয়। কলেজ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস, পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার মতো বিষয়ে নির্ধারিত শিক্ষক না থাকলে পাঠদানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ও বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষকসঙ্কট প্রকট। ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাতীয় সংসদে দেয়া তথ্যে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে আট হাজার ৪৮৬টি শূন্য থাকার কথা জানানো হয়। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি খালি। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষকসঙ্কটের প্রভাব সাধারণ পাঠদানের চেয়েও ব্যাপক। কারণ, এ শিক্ষায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপে কাজ শেখা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপযোগী দক্ষতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক না থাকলে যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষকসঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে শুধু নিয়োগের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন বাস্তব চাহিদাভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা। কোন জেলায়, কোন উপজেলায়, কোন বিষয়ে এবং কোন স্তরে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন- তার হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। একইসাথে নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তাই শিক্ষকসঙ্কট নিরসনে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় নিয়োগের আশ্বাস ও বিজ্ঞপ্তি চলতে থাকলেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি বাড়তেই থাকবে। 
শিক্ষক ঘাটতি নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি বড় সংখ্যার শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য শূন্য পদ পূরণের কথা জানিয়ে তিনি শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির সুযোগ না রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসঙ্কট নিরসনে শূন্য পদ পূরণ, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যালয়ের নাইটগার্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মচারীর পদ পূরণের উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।