ইউরোপে ‘নতুন আরব বসন্তে’র পদধ্বনি!
ফ্রান্সের লিমোজ শহরে বিক্ষোভকারীদের দেয়া আগুনে জ্বলছে সিটি হল ভবন : ইন্টারনেট।

ইন্ডিয়া টুডে 
শিক্ষা খাতের করুণ দশা, মাত্রাতিরিক্ত বাড়িভাড়া, মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমে এসেছে ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও আলবেনিয়াসহ অন্তত ৯টি রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে এই গণবিক্ষোভ। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীরা পুলিশের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন, আবার কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখল ও ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ইউরোপের বর্তমান এই ব্যাপক অস্থিরতা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে- মহাদেশটি কি তবে আরেকটি ‘আরব বসন্তের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? 
বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক সঙ্ঘাত, গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক মেরুকরণের আঁচ এখন ইউরোপের অন্দরেও প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ কিংবা তিরানার মতো প্রধান প্রধান শহরগুলোতে রাষ্ট্রীয় নীতি ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ। তবে প্রতিটি দেশের আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কারণ এক নয়। কোনো রাষ্ট্রে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাব ও বাজেট সঙ্কোচনকে দায়ী করা হচ্ছে, কোথাও আবার আবাসন সঙ্কট ও জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে; আবার কোনো দেশে বেকারত্ব ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ আন্দোলনকে তীব্র করে তুলেছে। বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় চলমান বিক্ষোভগুলো একপর্যায়ে সহিংস সংঘর্ষ, সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতেও শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক সংগঠনের কর্মীরা নানা দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। 
ইউরোপের ৯টি ভিন্ন রাষ্ট্রে গণবিক্ষোভের এই বিস্ফোরণ ২০১০ সালের শেষ ভাগে তিউনিসিয়া থেকে সূত্রপাত হওয়া ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্তের’ স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময়কার সেই গণআন্দোলন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ভূখণ্ডে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, যার পরিণামে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকা একাধিক একনায়ক শাসকের পতন ঘটেছিল। তবে ইউরোপের চলমান পরিস্থিতির সাথে আরব বসন্তের হুবহু মিল খোঁজার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করার তাগিদ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দুই অঞ্চলের গণ-আন্দোলনের মধ্যে কিছু বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মূল লক্ষ্যের দিক থেকে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আরব বসন্তের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল বহু রাষ্ট্রে জেঁকে বসা কর্তৃত্ববাদী একনায়কতন্ত্রের চিরতরে অবসান ঘটানো। বিপরীতে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের মূল উদ্দেশ্য কোনো প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেয়া নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 
ফ্রান্সকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের বিস্তার 
ইউরোপজুড়ে চলমান এই রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। গত সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে ফরাসি ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। যদিও অনেক স্থানে শান্তিপূর্ণ রাখা হয়েছিল, তবুও প্যারিস, মার্সেই ও লিমোজের মতো প্রধান শহরগুলো পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার সংঘর্ষ, সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের সাক্ষী হয়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে মোট ১১০টি পৃথক বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলন পরিচালনাকারী আয়োজকদের দাবি, এ সংখ্যাটি অন্তত আট লাখের কাছাকাছি ছিল। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন সংঘর্ষের জেরে প্রায় চার শ’ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। 
ইতালি ও বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ 
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও গত ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, সামরিক খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং সরকারের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে রাজধানী রোম ও তুরিন শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। 
 জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও প্রতিবাদের অন্বেষণ 
ইউরোপের যেসব দেশে সরাসরি সঙ্ঘাত বা সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, কেবল সেখানেই তরুণদের এই আন্দোলনের পরিধি সীমাবদ্ধ নেই। এর বাইরে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসের মতো রাষ্ট্রেও শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে।

Advertisement