রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ, ২৭ অক্টোবর আসামিপক্ষ

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

সাভার ও আশুলিয়ায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী শাইখ আশহাবুল ইয়ামিনসহ ২২ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে। এবার আসামিপক্ষের বক্তব্য শোনার পালা। তবে রোববার শুনানি শুরু হলেও সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৭ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ফলে বহুল আলোচিত এ মামলায় অভিযোগ গঠনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের জন্য আরো অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধিন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্য হলেন নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। শুনানিতে তিনি ইয়ামিন হত্যার ঘটনা, পুলিশের ব্যবহৃত সাঁজোয়া যান এবং এ ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নথি ও দলিল ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, ইয়ামিনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের যে এপিসি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিতে ‘ইউএন’ লেখা ছিল। বিষয়টি নিয়ে জাতিসঙ্ঘ আপত্তি জানিয়েছিল বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান। পরে এপিসি থেকে ‘ইউএন’ লেখা মুছে ফেলে সেটি ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এ বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল মন্তব্য করেন, অর্থাৎ নাম মুছে ফেলা হলেও এপিসিটির ব্যবহার বন্ধ করা হয়নি।
এরপর ঘটনাটি কেন মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে, তার ব্যাখ্যা দেন প্রসিকিউটর তামীম। এ সময় তিনি কয়েকটি নথি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করেন। নথিগুলো দাখিলের আগে সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কিংবা সম্পাদিত কি না, তা উল্লেখ করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। আদালতের এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে শুনানিতে উপস্থাপিত নথির উৎস ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
রোববারের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর শহিদুল ইসলাম সরদার, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ, মঈনুল করিম ও জহিরুল আমিনসহ অন্যরা। আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী আমীর হোসেনসহ অন্য আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের শুনানি শুরু হলেও সময় চাওয়ায় তা আগামী ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য ১৮ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। নির্ধারিত দিনে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপন শেষ করে। এরপর আসামিপক্ষের শুনানি শুরু হয়। মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা সাত আসামিকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় বলে মামলার কার্যক্রমের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার আসামিদের আটক থাকার সংখ্যা ও পরিচয়ের বিষয়ে আদালতের সর্বশেষ নথির সাথে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর পলাতক ১৩ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ওপর শুনানির দিন ধার্য করা হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে তাদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ রাখা হয়।
এ মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এদের মধ্যে গ্রেফতার আছেন ছয়জন। গত ২৬ জুলাই ট্রাইব্যুনাল ওই অভিযোগ আমলে নেন। অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় আন্দোলন দমনের সময় ২২ জনকে হত্যার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি চলছে। দুই পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো: আসাদুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আব্দুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম, সাভার থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শাহজামান, সাবেক পরিদর্শক এ এফ এম সায়েদ, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ আলী, সাবেক নায়েক মো: সুহেল মিয়া ও সাবেক কনস্টেবল মো: মাহফুজ মিয়া।
এ ছাড়া আসামির তালিকায় রয়েছেন সাভারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, সাভার উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো: আতিকুর রহমান, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মেহেদী হাসান তুষার, সাভারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো: রাজু আহম্মেদ, বনগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: ফরিদ, সাভার উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জামান খান, ঢাকা জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক মো: মিজানুর রহমান এবং শরফ আশরাফুল আলম। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন। ওই দিন সাভারে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তার মৃত্যু হয়।
ইয়ামিনের মৃত্যুর পর ঘটনাটিকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশের একটি সাঁজোয়া যানের ওপর ইয়ামিনের নিথর দেহ রাখা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে ফেলে দেয়া হয়। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ইয়ামিনের মৃত্যুর ঘটনা জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।
ইয়ামিন এমআইএসটির ওসমানী হলে থাকতেন। তার হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো বৃহত্তর অপরাধের অংশ। এ মামলায় মোট ২২ জনকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক সত্যতা নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং উপস্থাপিত নথি-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
অভিযোগ গঠন মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করবেন, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগ ও উপাদানের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু করার মতো ভিত্তি রয়েছে কি না। আসামিপক্ষও অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য, আপত্তি ও যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাবে। এরপর ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগোবে।
আগামী ২৭ অক্টোবর আসামিপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের পর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে সেদিনই অভিযোগ গঠন করা হবে, নাকি আরো শুনানির প্রয়োজন হবে, তা নির্ভর করবে বিচারিক প্যানেলের সিদ্ধান্তের ওপর।
শাইখ আশহাবুল ইয়ামিনসহ ২২ জনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলার পরবর্তী শুনানি তাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অভিযোগের পক্ষে যুক্তি ও নথি উপস্থাপন শেষ করেছে, অন্যদিকে আসামিপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠনের প্রশ্নটি নিষ্পত্তির দিকে এগোবে। জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় সাভার ও আশুলিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপের জন্য এখন ২৭ অক্টোবরের শুনানির দিকে তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।