
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
২৭ বছর বন্ধ থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোকিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) প্রস্তাবিত “ডেভেলপমেন্ট অব কোকিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া” প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১৫ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সম্ভাব্য সাফল্যের পাশাপাশি প্রকল্পটির সাথে জড়িয়ে আছে একাধিক ঝুঁকি ও প্রশ্ন।
মিলের ইতিহাস
বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মেন্ডা মৌজায় ১১.৩৫ একর জমিতে ব্যক্তিমালিকানায় মিলটি স্থাপিত হয়; উৎপাদন শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে মিলটি জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৯৭ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৬ সালে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন বিক্রির মাধ্যমে মিলটি বেসরকারীকরণ করে। কিন্তু নতুন মালিকপক্ষ উৎপাদন চালু করেনি। দীর্ঘদিন মিল বন্ধ থাকা এবং হস্তান্তরের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে সরকার ২০১৭ সালের ১১ মে মিলটি পুনরায় গ্রহণ ( টেক-ব্যাক) করে। এর বিরুদ্ধে সাবেক শেয়ারহোল্ডার হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি আদালত রুল ডিসচার্জ করেন, অর্থাৎ বিটিএমসির পক্ষে রায় আসে।
মিলের বর্তমান অবস্থা
সূত্র জানায়, এই মিলের স্থাপনাগুলো অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও যন্ত্রপাতি অনেক পুরনো। মিলের জমি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তাই পুরনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি সরিয়ে আধুনিক স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বসিয়ে মিল চালু করতে হবে। মিলের ভেতরে থাকা স্কুল ও মসজিদের জায়গা বাদ দিলে পিপিপিতে হস্তান্তরযোগ্য জমির পরিমাণ ১০.৫৮ একর, যার সম্ভাব্য মূল্য মৌজা রেট অনুযায়ী ৬৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের রূপরেখা বিষয়ে বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে-
ব্যয় : আনুমানিক ৫১৫ কোটি টাকা, যা একটি কম্পোজিট টেক্সটাইল ও আরএমজি ফ্যাক্টরি স্থাপনের গড় ব্যয়।
সরকারের দায় : প্রকল্পে সরকারের কোনো ব্যয় বা আর্থিক সংশ্লেষ নেই এবং কোনো ঝুঁকিও সরকার নেবে না।
জমি : জমি মূলধন হিসেবে বিবেচিত হবে না। বেসরকারি পার্টনারকে লিজ বা ইজারা দেয়া হবে, তবে জমি বন্ধক রাখার সুযোগ থাকবে না।
মেয়াদ : প্রাথমিকভাবে ৩০ বছর। মেয়াদ শেষে নবায়ন বা টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন পার্টনার নিয়োগ করা যেতে পারে।
আয় : বেসরকারি পার্টনার মাসিক বা বাৎসরিক হিসেবে বিটিএমসিকে লিজমানি দেবে।
দায়িত্ব : বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে প্রাইভেট পার্টনারের ওপর।
শিল্পের ধরন : টেক্সটাইল, আরএমজি, পাট সংশ্লিষ্ট শিল্প কারখানা অথবা ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজর সুপারিশকৃত ও পিএসি অনুমোদিত অন্য শিল্প।
জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠায়। ১০ নভেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত স্ক্রিনিং কমিটির সভায় প্রকল্পটি ৮০ নম্বরের মধ্যে ৬১.৪ পেয়েছে, ফলে পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নযোগ্য বলে মত দেয়া হয়। এরপর “প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইনস ফর পিপিপি প্রজেক্টস, ২০১৮”-এর ১০ নং অনুচ্ছেদ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ হিসেবে মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করতে ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজর নিয়োগ দেবে। তিনি শর্তাবলি ও পার্টনার নির্বাচনের নিয়মাবলি তৈরি করবেন, যা প্রজেক্ট অ্যাসেসমেন্ট কমিটি (পিএসি) অনুমোদন করবে। নির্বাচিত বেসরকারি পার্টনারের চূড়ান্ত অনুমোদন আবার মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) কাছে যাবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সারসংক্ষেপটি অনুমোদন করেছেন।
পিপিপিতে ঝুঁকিও রয়েছে!
এ বিষয়ে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০০৬ সালে বেসরকারীকরণের পর মালিকপক্ষ মিল চালু করেনি, আর এর খেসারত হিসেবে মিল আরো জরাজীর্ণ হয়েছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, বিটিএমসির চারটি মিল ইতোমধ্যে পিপিপিতে বেসরকারি অংশীদারদের কাছে হস্তান্তর হয়েছে। সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি কেমন, তা এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পার্টনারও যাতে একই পথে না হাঁটে, তা নিশ্চিত করার শক্ত শর্ত ও তদারকি ব্যবস্থা কী থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তা ছাড়াও আইনি জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে এই প্রকল্পে। হাইকোর্টে রুল ডিসচার্জ হলেও সাবেক শেয়ারহোল্ডার উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারেন। আপিলের মামলা চললে বিনিয়োগকারীর আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
জমির মূল্যায়ন ও লিজের শর্ত : ৬৯ কোটি টাকার জমির মূল্য নির্ধারণ হয়েছে মৌজা রেট অনুযায়ী, যা সাধারণত বাজারদরের চেয়ে কম। ৩০ বছরের লিজে বাজারমূল্য ও লিজমানির হার কীভাবে নির্ধারণ হবে, তা স্বচ্ছভাবে না হলে সরকার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এছাড়া ইজারা দেয়া জমিতে “অন্য শিল্প” স্থাপনের সুযোগ থাকায় জমির ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিনিয়োগকারী পাওয়ার অনিশ্চয়তা : জমি বন্ধক রাখার সুযোগ না থাকায় ৫১৫ কোটি টাকার ঋণ সংগ্রহ বেসরকারি পার্টনারের জন্য কঠিন হতে পারে। এতে যোগ্য বিনিয়োগকারীর আগ্রহ কমতে পারে। আবার টেক্সটাইল খাতের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও সময়ক্ষেপণ : নীতিগত অনুমোদন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পার্টনার নির্বাচন ও চূড়ান্ত অনুমোদনের ধাপগুলো সময়সাপেক্ষ। প্রতিটি ধাপে বিলম্ব হলে প্রকল্প শুরুই হতে অনেক দেরি হতে পারে।
কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি : বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এতে “ব্যাপক কর্মসংস্থান” সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কত মানুষের কাজ হবে এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকার থাকবে কি না, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা শর্ত নেই। আধুনিক যন্ত্রপাতিনির্ভর কারখানায় কর্মসংস্থান সীমিত হতে পারে। তবে ঝুঁকি থাকলেও সরকারি অর্থ ছাড়াই একটি পরিত্যক্ত সম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ এ প্রকল্পে আছে। সফল হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে, বিটিএমসি নিয়মিত লিজমানি পাবে এবং পোশাক ও বস্ত্র খাতে নতুন সক্ষমতা তৈরি হবে।
কাগজে-কলমে প্রকল্পটি সরকারের জন্য ঝুঁকিমুক্ত দেখানো হয়েছে। কিন্তু সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বিনিয়োগকারী বাছাই, স্বচ্ছ লিজ-শর্ত এবং কঠোর তদারকির ওপর। অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এসব বিষয়ে এখনই স্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রস্তাবটি আজ অনুষ্ঠিতব্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত্র মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








