
- আটক ১, ঘটনাস্থল পরিদর্শন তদন্ত কমিটির
- যশোরের এক পরিবারের ৪ জন নিখোঁজ
- ২ বোনের মৃত্যুতে নাগরপুরে শোকের ছায়া
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের নাম জানা গেলেও অঙ্গার হয়ে যাওয়া কোনটি কার লাশ সেই পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট করা হবে। প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ দিকে, যশোরের এক পরিবারের চারজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুই বোন মালিহা ও নাবিলার মৃত্যুতে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কক্সবাজার অফিস ও উখিয়া সংবাদদাতা জানান, পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে। শনিবার দিনগত রাতে পুলিশ বাদি হয়ে মামলাটি করে। গতকাল রোববার সকালে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে শনিবার বিকেল ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। এ মামলায় গতকাল তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহানের নেতৃত্বে রোববার দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্ট স্থানীয়দের বক্তব্য সংগ্রহের পাশাপাশি ঘটনার সাথে সংশ্লেষ থাকা নানা বিষয়ে খোঁজ খবরে নেন।
এ সময় তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো ধরনের অনুমোদন ছিল না। ঘটনায় আগুনের সূত্রপাতের কারণসহ অনুমোদন না নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এর আগে চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তদন্তের পর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির কী কী ধরনের অনিয়ম রয়েছে তার সার্বিক তথ্যাদি উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া উদ্ধার ১০ জনের লাশের পরিচয় ঘিরে বিভ্রান্তির ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের সাথে তদন্ত কমিটির সদস্যদের যোগাযোগ হয়েছে। কিন্তু তাদের তথ্যের সাথে লাশের সংখ্যার মিল থাকলেও মৃতদেহগুলো অঙ্গার হয়ে বিকৃত হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। মৃতদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার পর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এদিকে, উদ্ধার হওয়া লাশের ব্যাপারে ডিএনএ পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘লাশগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কক্সবাজারের সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো: আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞদল নিয়ে এসে এখানেই ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এভাবে প্রয়োজনীয় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তদন্তের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাতের কারণ জানা যাবে।
কক্সবাজারের ইনানীতে পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার ‘টুপটুপ’ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের নাম জানা গেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ছয়জন। অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা হলেন- ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নে ফায়িজান আহম্মেদ, ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো: নাফিস তেহামী, জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তারা হলেন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন সাদী (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন হতাহতদের বিষয়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে রিসোর্টের রান্নাঘরের দিক থেকে বিকট শব্দ হওয়ার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্থাপনায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় উদ্ধার অভিযানও পরিচালনা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা চিন্তিত
টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁর অগ্নিকাণ্ডে একসাথে ১০ জনের মৃত্যু স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের চিন্তার মুখে ফেলেছেন। বিশেষ করে পর্যটন স্পটে স্থাপনা পরিচালনা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি যথাযথ ছিল কি না, এসব বিষয় তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। অগ্নিকাণ্ডের মামলায় প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মীকে গ্রেফতারের পর তদন্তে আরো কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন, উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান।
উখিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম শাহজালাল চৌধুরী বলেছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এখানে পর্যটক আসবে না। আমি উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে ফায়ার সার্ভিসের জন্য কেউ জায়গা দেয়নি। আমি জায়গা দিয়েই উখিয়াতে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করেছিলাম। এখন পর্যটনের সময়। কক্সবাজার থেকে পর্যটকরা উখিয়ার ইনানীমুখী হচ্ছে। ইনানী পর্যটন জোন হিসেবে এখানেও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করতে হবে।
যশোরের একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ
যশোর অফিস জানায়, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে রিসোর্টে থাকা একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। তারা হলেন- যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর এলাকার মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই শিশুসন্তান রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
নাহিদুর ঢাকায় শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকার মিরপুর শ্যাওড়াপাড়াতে বসবাস করতেন। অগ্নিকাণ্ডের পর নাহিদুরের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন পরিবারের সদস্য ও কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীরা। স্বজনদের আশঙ্কা, উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় লাশের মধ্যে তারাও থাকতে পারেন।
নাহিদুরের বড়ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স মনিরামপুর পৌরশহরে বসাবস করেন। নাহিদুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এই প্রতিবেদককে কক্সবাজারের হোটেলটির বুকিংয়ের বিলের ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। বিলের কপিতে দেখা, যায় নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টের একটি কক্ষ বুকিং করেছিলেন। নাহিদুর ১১ অক্টোবর রিসোর্ট বুকিং দিয়েছিলেন। ১৮ অক্টোবর বেলা ১টায় তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল।
জাহিদুর জানান, নাহিদুর শুক্রবার কক্সবাজার যাবেন বলে বলেছিলেন। শনিবার আগুনের ঘটনা জানার পর ভাইকে মোবাইলে ফোন দেন। কিন্তু তিনি মোবাইলে নাহিদুর বা পরিবারের কাউকে পাচ্ছেন না। মোবাইল ফোনে তার ভাইদের না পেয়ে শনিবার সন্ধ্যায় নিজে রওনা হয়েছেন। নাহিদুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে রাতে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, নাহিদ নিখোঁজ রয়েছেন, এটি জানা গেছে। বাকিদের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
তিনি জানান, ছয়জন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লাশ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বাকি চারজন নাহিদুরের পরিবার।
এদিকে, নাহিদুর ও তার পরিবার নিখোঁজের খবর শনিবার রাতে ছড়িয়ে পড়লে মনিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাদের ছবি পোস্ট করে সমবেদনা জানাতে দেখা গেছে।
নাগরপুরের দুই বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের উখিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার দুই বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে । নিহত দুই বোন হলেন- উপজেলার বাউসাইদ গ্রামের বাসিন্দা মামুনুর রশিদ মামুনের কন্যা মালিহা ও নাবিলা। মামুনুর রশিদ মামুন নাগরপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো: হুমায়ুন কবিরের মেজ ভাই। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে অগ্নিকাণ্ডে দুই বোন আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। পরবর্তীতে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের নিজ গ্রাম বাউসাইদসহ পুরো নাগরপুর উপজেলায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








