
নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান সাইবার আইন সরকারের জন্য আত্মঘাতী মন্তব্য করে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংবাদপত্র মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবি নেতারা। সরকারের উদ্দেশে তারা বলছেন, পৃথিবীতে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। তাই দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে এক দিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।
গতকাল রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভায় তারা এ কথা বলেন।
বৈঠক পরিচালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এতে আলোচনায় অংশ নেন, নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম, অনলাইন এডিটর্স ফোরামের আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান পিন্টু, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ প্রমুখ।
আলোচনায় পৃথিবীতে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় জানিয়ে সরকারের উদ্দেশে নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে এক দিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।
নোয়াব সভাপতি বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার সমালোচনার বিরুদ্ধে আইন করতে চায়; কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর তারাই অন্যায়ের শিকার হয় বলেও জানান মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আইনের প্রয়োজন আছে। সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা করতে হবে। সরকারের সমালোচনা হবেই, গণতান্ত্রিক সমাজে তা হতেই পারে। এই দু’টিকে আলাদা করা না গেলে বিপদ থেকে যাবে।
ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রণয়ন করা উচিত মন্তব্য করে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক বলেন, আইন প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেয়ার সুযোগ রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নোয়াব সভাপতি। আইনের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন দলের নেতার ফোনেই কাউকে গ্রেফতারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে জেলায় জেলায় আলোচনা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামত নেয়ার আহ্বান জানান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সামাজিক মাধ্যম জায়ান্ট মেটার (ফেসবুক) মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান বিতর্কিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হবে। একই সাথে এটি সরকারের জন্যও বুমেরাং ও আত্মঘাতী হতে পারে।
তিনি বলেন, ব্যবসা বাড়ানোর স্বার্থে মেটা সঙ্ঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্যকে বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ বা যৌক্তিক আলোচনাকে সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন চাপিয়ে দেয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।
আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম এ বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১২ সালে রামু বৌদ্ধপল্লীতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যা উসকে দেয়া এবং সম্প্রতি ফেসবুকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার মতো সহিংসতার ঘটনায় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফেসবুকের অপব্যবহার ছিল।
শফিকুল আলম বলেন, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সাথে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিল করার বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার থেকে সুরক্ষার উপায়ও বের করতে হবে।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে শফিকুল আলম পরামর্শ দেন, মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় না রেখে দেওয়ানি আইনের অধীনে এনে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান করা উচিত। তিনি বলেন, বিদেশে বড় পত্রিকাগুলো সম্ভাব্য মানহানি মামলার জরিমানা পরিশোধের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সম্মানহানি করলে তাকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা দিতে হয়।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেয়া ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি শুধু ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের হাত-পা বেঁধে দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম বা মিডিয়া হাউজ বন্ধ করে দেয়ার মতো বিধানও রয়েছে।
শহীদুল ইসলাম আরো বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ সব প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার অবাধ ক্ষমতা পেয়েছেন। এতে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও আইনে নেই। তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান এবং অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অতীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও দায়মুক্তির বিধান ছিল না। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে এ আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে জন্য তাদের আইনের আওতাবহির্ভূত রাখার বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা প্রয়োজন। অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠনকাঠামো নিয়েও আপত্তি জানান শরীফুজ্জামান পিন্টু।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচজন মন্ত্রী, ৯ জন সচিব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে প্রস্তাবিত কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ভারসাম্য নেই। নির্বাহী বিভাগকে এভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








