
নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনার ২৭ বছরের পুরনো চুক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হাইকোর্টের রুল ও স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকার পরেও ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে বিমান সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর দায় তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপরে চাপাতে গঠিত তদন্ত কমিটির মিথ্যা লিখিত বক্তব্যে সই না করায় তিনি শাস্তি পেয়েছেন। এমন অভিযোগ তুলে বিমানবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেছেন। আবেদনটি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে করা। নয়া দিগন্তের কাছে থাকা নথিপত্রে চুক্তির আর্থিক হিসাব, আদালতের আদেশ ও বিমান সদরের চিঠিপত্রের কপি রয়েছে। তবে আবেদনকারীর অভিযোগগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করত বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
দরপত্র থেকে চুক্তি : নথি অনুযায়ী, বিমান বাহিনী সদর দফতরে ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আটটি মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ কেনার ইনডেন্ট প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদফতরে (ডিজিডিপি) পাঠায়। ১৯৯৮ সালের ১১ জানুয়ারি জানানো হয়, দরপত্রে নির্ধারিত দামের ১০.২০ শতাংশ বিমানবাহিনীর বাজেট থেকে মেটানো হবে। বাকি অংশ পরিশোধ হবে কাউন্টার ট্রেডে, অর্থাৎ কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে। এ জন্য পাট মন্ত্রণালয়ের সাথে বিমানবাহিনীর একটি চুক্তিও হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রে একমাত্র দরদাতা ছিল রুশ প্রতিষ্ঠান মিগ-মাপো।
আবেদনের সাথে সংযুক্ত সারসংক্ষেপে দাবি করা হয়েছে, ক্রয়প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনকাল টেন্ডারের শর্ত বদলে ফেলা হয়। কাউন্টার ট্রেড বাতিল করে পুরো মূল্য নগদে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। চুক্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং বিমান বাংলাদেশে পৌঁছলে বাকি ৮০ শতাংশ দেয়ার শর্ত যুক্ত হয়। এখানে বিক্রেতার স্বার্থে ওয়ারেন্টির শর্তটি বাদ দেয়া হয়। সারসংক্ষেপে আরো বলা হয়েছে, নতুন বিমান তৈরির পর সরবরাহের কথা থাকলেও আগের প্রস্তুতকৃত বিমান সরবরাহ করা হয়েছিল। ডিজিডিপির মাধ্যমে চুক্তির বদলে ১৯৯৯ সালের ২৮ জুন বাংলাদেশ সরকার ও মিগ-মাপোর মধ্যে সরাসরি চুক্তি (নম্বর বিকে/৯০৫০০৯০১০০১০০) সই হয়। এর আগে ওই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সাথে একটি সহযোগিতা-সংক্রান্ত কারিগরি চুক্তিও হয়েছিল।
বিমান সদরে সরবরাহ পরিদফতরের ১৯৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে বিমান ও সরঞ্জামের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা। বীমা খরচ ০.১০ শতাংশ (৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা) ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট (৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা) মিলিয়ে ৬৬ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আরেকটি চিঠিতে চুক্তির ২০ শতাংশ অগ্রিম মূল্য, অর্থাৎ ২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১১৫ কোটি টাকা), মস্কোর ভনেশইকোনম ব্যাংকের মাধ্যমে মিগ-মাপোর হিসাবে পরিশোধের অনুমোদন চাওয়া হয়। জানা যায় যে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বীমাকরণ এবং অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ করা হয়েছিল।
হাইকোর্টের রুল ও স্থগিতাদেশ : বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো: আখতারুজ্জামান চুক্তির ড. কামাল হোসেনের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিরুদ্ধে রিট (৩৭৭৪/১৯৯৯) করেন। ১৯৯৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুলনিশি জারি করে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। প্রশ্ন ছিল, ২৮ জুনের চুক্তি ও ৯ ফেব্রুয়ারির সহযোগিতা-চুক্তি কেন ‘আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া, অবৈধ ও অকার্যকর’ ঘোষণা করা হবে না। রিট আদেশে এই আটটি মিগ-২৯ সংক্রান্ত সব পরবর্তী অর্থ পরিশোধ স্থগিত করা হয়। পরে বিমান সদরের পরিকল্পনা শাখার একটি ‘গোপনীয়’ চিঠিতে দেখা যায়, রুল নিশির অনুলিপি ১৯৯৯ সালের ৭ অক্টোবর সরবরাহ পরিদফতরেও পাঠানো হয়। অর্থাৎ বিমান সদর ওই সময়ে আদেশ সম্পর্কে অবগত ছিল।
আবেদনকারীর অভিযোগ : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বরাবরে আবেদনকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম আখতারুজজামান খান (অব:) তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার ছিলেন। তার দাবি, ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে বিমানগুলো আনা হয়। আদালত অবমাননার দায় থেকে মুক্তি পেতে তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে (সহকারী বিমানবাহিনী প্রধান-রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালক-প্রজেক্ট ও পরিচালক-সরবরাহ) দায়ী করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে একমাত্র সাক্ষী নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, কমিটি তাকে আগে থেকে টাইপ করা বক্তব্যে সই করতে বলে এবং ভয়ভীতি দেখায়। কিন্তু তিনি নীতিগত কারণে টাইপকৃত মিথ্যা বক্তব্যে স্বাক্ষর প্রদানে অস্বীকার করেন। ফলে শাস্তি হিসেবে ওই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে ‘লেটার অব ডিসপ্লেজার’ দেয়া, বদলি, পদোন্নতি স্থগিত, জাতিসঙ্ঘ মিশন ও বিদেশী প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত করাসহ ক্যাজুয়াল ছুটি বন্ধ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। ২০০১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি পদোন্নতিবিহীন অবসরে যান। তার আরো অভিযোগ, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাকরিতে প্রযোজ্য সুবিধাদিসহ ডিওএইচএস প্লট বরাদ্দ থেকেও তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। তিন কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও পরে তাদের একজন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে সকলেই সাধারণ নিয়মে অবসরে যান বলে আবেদনে উল্লেখ করা আছে।
আবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মামলাটি খারিজ করে দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা অবসরের পর বিমান সদর ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে তিনি ১২ বার আবেদন করলেও তা বিবেচনা করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে তিনি একাধিকবার আবেদন করেছেন। এবার তার চাওয়া- মামলা পুনরায় চালুকরণ, প্রত্যাশিত ও প্রযোজ্য পদোন্নতিসহ সংশ্লিষ্ট সব সুবিধাদি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিকরণ ও প্লট বরাদ্দ।
সরকারের নতুন কমিটি : এর মধ্যেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ৮ জুলাই প্রজ্ঞাপনে একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে ‘বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার’ অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের আবেদন যাচাই করবে। আবেদন জমা দেয়ার শেষ তারিখ ১০ আগস্ট। কমিটির সভাপতি একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। সুপারিশ জমা দিতে হবে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে। প্রশ্ন হলো, প্রজ্ঞাপনে সময়কাল শুধু ২০০৯ হতে ২০২৪ ধরা হয়েছে। উপরি উক্ত ঘটনার মূল সময় ১৯৯৯ থেকে ২০০১ হলেও তা বিবেচনা করার সুযোগ রাখা হয়নি।
ভুক্তভোগীর দাবি- আওয়ামী লীগ সরকার কি ২০০৯ সালের আগে অনিয়ম করে নাই? উপরি উক্ত ঘটনাটির আলোকে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যায়ভাবে ভুক্তভোগী কর্মকর্তার আবেদনটি বিশেষ বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। অনুরূপ অন্য কোনো ঘটনা থাকলে সেগুলোর বিবেচনার দাবি রাখে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








