রামগতির চরে মহিষের দইয়ের চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ছে
রামগতির চরে মহিষের দইয়ের চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ছে।

রেজাউল হক রামগতি (লক্ষ্মীপুর)

Advertisement

মেঘনার বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর। চার দিকে সবুজ ঘাসের মাঠে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে মহিষ। যুগ যুগ ধরে এসব চরের মানুষের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন মহিষ পালন। সেই মহিষের দুধে তৈরি ঐতিহ্যবাহী টক দই, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মহিষা দই’ নামে, এখন লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে উৎপাদন ও বাজার। দুই উপজেলায় বছরে মহিষের দই বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকার।
স্থানীয়ভাবে বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে মহিষের টক দই পরিবেশনের দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। গরুর দুধের দইয়ের তুলনায় স্বাদ, ঘনত্ব ও স্বতন্ত্র ঘ্রাণের কারণে মহিষের দইয়ের আলাদা কদর রয়েছে। চর থেকে নৌপথে সংগ্রহ করা কাঁচা মহিষের দুধ মাটির হাঁড়ি বা টালিতে জমিয়ে তৈরি করা হয় এ দই।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রামগতির বিভিন্ন চরে ৮ হাজার ২৯০টি মহিষ রয়েছে। এসব মহিষ থেকে দৈনিক প্রায় ১২ টন দুধ উৎপাদিত হয়। এ দুধ থেকে বছরে দই তৈরি ও বিক্রি হয় প্রায় ৪ হাজার ৩৮০ টন। অন্য দিকে কমলনগরের বিভিন্ন চরে রয়েছে ৩ হাজার ৫৫০টি মহিষ। সেখানেও বছরে প্রায় ৯৭২ টন দই উৎপাদিত হয়। এই দুই উপজেলায় উৎপাদিত টক দইয়ের বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। উৎপাদিত দই প্রতি কেজি ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
মহিষ মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, রামগতির চর আবদুল্লাহ, তেলিরচর, মৌলভীর চর, চরমুজাম্মেল, হাজিপুর, মলনচরা, লম্বাখালী, পশ্চিম বালুরচর, বড়খেরী, মাঝেরচর, সেবাগ্রাম, চর আলেকজান্ডার ও চর বাদাম এবং কমলনগরের চর কাকড়া, মাইজের চর ও চর শামছুদ্দিনসহ বিভিন্ন এলাকায় মহিষের বাথান রয়েছে। এসব বাথান থেকেই দই তৈরির প্রধান উপকরণ দুধ সংগ্রহ করা হয়।
চাহিদা বাড়লেও মহিষ পালন ও দই উৎপাদনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতারও অভিযোগ রয়েছে। বাথান মালিকরা জানান, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় কিছু ভূমিদস্যু সম্প্রতি মহিষ পালন ও দই প্রস্তুতিতে চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা না দিলে চরে মহিষ পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চর দখল ও বিক্রির কারণে কমছে মহিষের চারণভূমিও। খাদ্যসঙ্কট, ব্যাংকঋণ না পাওয়া, প্রশিক্ষণের অভাব এবং নদীপথে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকিও তাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
মহিষ পালনকারী লোকমান হোসেন বলেন, তার ৪০০টির বেশি মহিষ রয়েছে। এসব মহিষ পালনের জন্য রাজনৈতিক নেতা ও ভূমিদস্যুদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। চর দখল করে অন্যের কাছে বিক্রি করায় চারণভূমিও কমে যাচ্ছে।
রামগতি উপজেলা মহিষ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ হোসেন বলেন, সমিতিতে ৪০ জনের বেশি সদস্য রয়েছেন। মহিষের সংখ্যা ও দইয়ের চাহিদা বাড়লেও চাঁদাবাজির কারণে অনেকেই মহিষ পালন ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছেন।
আলেকজান্ডার বাজারের নিউ আবদুর রব দধি বিতানের স্বত্বাধিকারী আবুল খায়ের বলেন, তার দোকানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত টন দুধ প্রয়োজন হয়। চরাঞ্চল থেকেই এসব দুধ সংগ্রহ করেন তিনি।
কমলনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: শাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ অঞ্চলের চরগুলো মহিষ পালনের জন্য উপযোগী। মহিষের সংখ্যা বাড়ছে। বাথান মালিকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
রামগতি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা: মো: রুবেল সরকার বলেন, আগের তুলনায় উপজেলায় মহিষের বাথান বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে চাহিদাও। মহিষের চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে খামারি এবং বাথান মালিকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।