সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে কর্মীরা দিশেহারা

বিশেষ সংবাদদাতা 

Advertisement

ইয়েমেনের হাউছিদের দফায় দফায় মিসাইল হামলায় সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়েছে। সৌদি আরবও হাউছিদের আস্তানা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই হামলায় এখন পর্যন্ত রিয়াদ বিমানবন্দরে দুইজন বাংলাদেশী নিহত এবং ২৭ জন আহত হওয়ার সংবাদ দিয়েছে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস। 
সৌদি আরব থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বলছেন, তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত, শঙ্কিত। কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। সৌদি সরকারও হাউছিদের হামলার মাত্রা বাড়তে থাকায় রিয়াদের কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট উঠানামার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে আগেই। তারা অলিখিতভাবে দুই বিমামবন্দরকে রেড জোন ঘোষণা দিয়ে ২১ দিন পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে আলোচনায় সমাধান হয়ে গেলে আগেও খুলে দেয়া হতে পারে। 
অপরদিকে সৌদি আরবে হাউছিদের হামলা বাড়তে থাকায় ভারতের ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স সৌদি আরবের চারটি গন্তব্যই  আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের সব ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে ঢাকা থেকে সৌদিগামী যাত্রীদের বহনকারী ইন্ডিগোর ২২টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ভারত হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী প্রবাসী বাংলাদেশী ও অন্যান্য যাত্রীর ভ্রমণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মাম এয়ারপোর্টে দেশী বিদেশী কোনো ফ্লাইট উঠানামা করেনি। মূলত সারাবিশ্ব থেকে এ দু’টি এয়ারপোর্ট বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে বিকল্প হিসাবে মদিনা ও জেদ্দায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ফ্লাইট চলাচল এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশী বিদেশী সংবাদ মাধ্যম।
যুূদ্ধের কারণে সৌদির মতো বাংলাদেশেও  এয়ারলাইন্স সেক্টরে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী ছুটিতে এসে আটকা পড়েছেন। তারা ওই সব গন্তব্যের ফ্লাইট না পেয়ে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছেন। কিভাবে কোন পথে দ্রুত কর্মস্থান এলাকায় যেতে পারবেন তা জানতে চাচ্ছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এসব কর্মীর পাশাপাশি নতুন চাকরি নিয়ে সৌদি যাওয়া যাত্রীদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিকিট পরিবর্তনের সুযোগ দিতে শুরু করেছে। তবে সেটি খুব নগন্য বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। যার কারণে অনেকেই তাদের ভিসার মেয়াদ চলে যাওয়ার আফঙ্কা করছেন বলে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 
এদিকে গতকাল শুক্রবারও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রেস বুলেটিন দিয়ে সৌদি ক্রাইসিসে ঢাকা থেকে শিডিউল ফ্লাইট বাতিলের সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছে। 
বেবিচকের সহকারী পরিচালক ও মুখপাত্র কাওছার মাহমুদের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামের সাথে ফ্লাইট চলাচল বিঘœ হওয়ায় এখন পর্যন্ত বিমান, ইউএস বাংলাসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মোট ৪৪টি সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অপরদিকে ইন্ডিগো, সালাম এয়ার, ফ্লাই দুবাইসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মোট ৬৩টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সবমিলিয়ে ১০৭টি ফ্লাইটের মোট ১৬ হাজার ৬২০ জন যাত্রী ঢাকা থেকে গন্তব্য রওনা হতে পারেননি। তবে এদের মধ্য কিছু যাত্রী ঝুঁকি নিয়ে জেদ্দা এবং মদিনার টিকিট কেটে, কেউ পরিবর্তন করে রওনা হয়েছেন। 
ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ঢাকা অফিস কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জানিয়েছে, সৌদি আরবের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনা থেকে যাওয়া-আসার ফ্লাইট ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল রাখা হয়েছে।
শুধু ইন্ডিগো নয়, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে বিভিন্ন বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট সূচি পরিবর্তন ও চলাচল স্থগিত করছে। এতে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসী, নতুন কর্মী এবং ছুটিতে দেশে আসা যাত্রীদের যাত্রা নিয়েও মারাত্মক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবগামী যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে একাধিক এয়ারলাইন্স। ট্রানজিটের টিকিট থাকলে শুধু ঢাকা থেকে প্রথম ফ্লাইটের অবস্থা নয়, পরবর্তী সংযোগকারী ফ্লাইটও ঠিক আছে কি-না, তা যাচাই করার জন্য ওই রুটের যাত্রীদের অনুরোধ জানিয়েছে তারা।
দু’দিন আগে সৌদির দাম্মাম থেকে প্রবাসী বাংলাদেশী জনি জানান, হাউছিরা মনে হয় সহজে থামবে না। তারা ঘোষণা দিয়েছে, মক্কা মদিনায় কোনো হামলা করবে না। তবে রিয়াদ-দাম্মামে হামলা চালিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশীরা আছি সবচেয়ে বেশি বিপদে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন বাইরে থেকে নিত্য পণ্যের মালামাল ঠিকভাবে আসতে পারছে না। এতে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে। যে গ্যাস সিলিন্ডার আমরা ২৪-২৬ রিয়ালে কিনতাম সেটির দাম এখন ৪৫-৫০ রিয়াল হয়ে গেছে। পরিস্থিতি ভালো নয়। অনেক কোম্পানি হামলার আশঙ্কায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন বেশি বেকার হবে বাংলাদেশীরা। অনেকে এ দেশে এসে এমনিতেই আকামা নিয়ে বিপদের মধ্য ছিল আগেই। এরসাথে যোগ হয়েছে যুদ্ধ। কী যে হবে আমাদের তা আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।