
হাবিবুল বাশার
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটলে ভবিষ্যতে আবারো কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণ না করে দলীয়করণ ও দখলদারিত্বের পথ বেছে নিয়েছে। একই সাথে তিনি জানান, গণভোটের রায় সংসদে বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তা আদায়ের চেষ্টা করা হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসব বিষয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। সাক্ষাৎকারে তিনি বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক অবস্থান, বিরোধী দলের কর্মপন্থা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন। দৈনিক নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-
নয়া দিগন্ত : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার এসেছে। নির্বাচনের আগে দেয়া অঙ্গীকার, রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকারকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাশেদ প্রধান : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা দেখতে হবে। তারা তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখেছিল- সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। কিন্তু আমার মূল্যায়ন হলো, এই তিনটি ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজন করে বিএনপির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেই তারা দায়িত্ব শেষ করেছে।
আমরা তখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছিলাম। আমাদের আশঙ্কা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এখন বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় মেনে চলার প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে আমাদের সেই আশঙ্কা আরো জোরালো হয়েছে।
আমার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার দায় যেমন রয়েছে, তেমনি বর্তমান সরকারেরও দায় রয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছে, তা জনগণের প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক। তারা সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটছে। কিন্তু সংশোধনের মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন আনা হয়, সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন থাকে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচনের পর বিভিন্ন স্থানে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
রাশেদ প্রধান : আমার মতে, এর অন্যতম কারণ প্রশাসনিক কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন না আসা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার- কেউই আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারেনি বলে আমি মনে করি।
একই সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমেও প্রত্যাশিত মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না। মব কালচার ও চাঁদাবাজি বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে এসব কমেছে বলে মনে হচ্ছে না। টেম্পোস্ট্যান্ড, হাসপাতাল, মাদরাসা কমিটি, মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দায়িত্ব বণ্টন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও দলীয় বিবেচনা কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
নয়া দিগন্ত : এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কী করা উচিত?
রাশেদ প্রধান : আমার সরাসরি বক্তব্য হলো, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে এবং বিএনপিকেও নিজেদের রাজনৈতিক আচরণ সংশোধন করতে হবে। শুধু সংবিধান সংশোধনের কথা বললে হবে না; রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চর্চা, জবাবদিহি ও ক্ষমতা ব্যবহারের ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে।
একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ক্ষমতায় এসে যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও ক্ষেত্রের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
নয়া দিগন্ত : বিরোধী দল হিসেবে আপনারা কি শুধু সরকারের সমালোচনা করছেন, নাকি বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে সহযোগিতাও করছেন?
রাশেদ প্রধান : আমি বিষয়টিকে শুধু সমালোচনা হিসেবে দেখতে চাই না। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য জাতীয় সংসদে বিভিন্ন সঙ্কটে সমাধানের পথ খুঁজেছে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছে। কিন্তু আমাদের অভিযোগ, সরকার অনেক ক্ষেত্রে সেই সহযোগিতা গ্রহণ না করে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে কটাক্ষ করেছে।
আমরা প্রথমে সহযোগিতা করতে চাই, প্রয়োজন হলে গঠনমূলক সমালোচনা করতে চাই। সরকার যদি সেটিও গ্রহণ না করে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা হরতাল, অবরোধ বা ভাঙচুরের মতো কর্মসূচির পথে যাইনি। আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনতে চাই। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের ভুল তুলে ধরা নয়, বরং বিকল্প সমাধানও সামনে আনা।
নয়া দিগন্ত : ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের করণীয় কী?
রাশেদ প্রধান : আধিপত্যবাদ শুধু বিদেশ থেকে আসে না; দেশের ভেতরেও ক্ষমতাবানদের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বর্তমানে আমরা অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ দেখতে পাচ্ছি। সরকার নিজেই যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে বিরোধী দলের পক্ষে তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও বরাদ্দ নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্বের অভিযোগও গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।
মিরপুরের ঘটনায় জামায়াতের পক্ষ থেকে রাড্ডাকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলতে চাই, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। তবে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিরোধী দল সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নয়া দিগন্ত : জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, এর সমাধান কী? সরকারের দেখানো বাধাগুলোকে কিভাবে দেখছেন?
রাশেদ প্রধান : জুলাই জাতীয় সনদে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি ও অন্যান্য দলেরও বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত ছিল। কিন্তু গণভোটের সময় জনগণের সামনে যে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটির পক্ষে-বিপক্ষে ভোট হয়েছে। অর্থাৎ দলীয় ভিন্নমত আর গণভোটে জনগণের দেয়া রায় এক বিষয় নয়।
আমাদের বক্তব্য, গণভোটের রায়কে সম্মান করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ বের করতে হবে। নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের প্রশ্নে বিএনপির আপত্তি ছিল, ব্যয়ের কথাও বলা হয়েছিল। এখন আবার নতুন গণভোটের কথা উঠলে প্রশ্ন আসে, আগের গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?
সরকার যে আইনি জটিলতার কথা বলছে, সেগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া যেতে পারে। কিন্তু আইনি ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আমার আশঙ্কা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সীমিত হবে বলেই সরকার পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না করে বিদ্যমান গণভোটের ভিত্তিতেই সমাধান করা হোক।
নয়া দিগন্ত : তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়েছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন?
রাশেদ প্রধান : আমার মূল্যায়নে, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময়ের বিএনপি এবং বর্তমান বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান বিএনপি প্রকাশ্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করলেও পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা স্বাধীন অবস্থান নিতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রকল্পটি নিয়ে চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনা আলোচনায় এসেছিল। পরে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করা জরুরি।
আমরা চাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো দেশের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : আবরার ফাহাদ ও শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
রাশেদ প্রধান : আবরার ফাহাদ ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। তাকে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক সহনশীলতার জন্য বড় আঘাত ছিল। অন্যদিকে শরিফ ওসমান হাদি ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে উদ্ঘাটন করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশের বাইরে অবস্থান করলে তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন। তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
আমার অভিযোগ, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বর্তমান সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শহীদদের স্মৃতি রাজনৈতিক প্রচারের বিষয় না হয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হওয়া উচিত।
নয়া দিগন্ত : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সঙ্কট, জ্বালানি সমস্যা ও ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের কী করা উচিত?
রাশেদ প্রধান : বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আমার অভিযোগ, মূল্যবৃদ্ধি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্কটের কারণে কর্মসংস্থান বাড়ার পরিবর্তে বেকারত্ব বাড়ছে। চাঁদাবাজির অভিযোগও ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট শুধু আবাসিক জীবনেই নয়, শিল্পকারখানার উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় ভিত্তি তৈরী পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়। এসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান, রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগও তদন্ত করা প্রয়োজন। শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মীরা অতিরিক্ত ব্যয়ের শিকার না হন। একই সাথে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগের পরিবেশ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিরোধী দল হিসেবে আমরা বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত, তবে সরকারকে সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে জাগপার অবস্থান কী? জোটের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো সমস্যা হয় কি?
রাশেদ প্রধান : জাগপা ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আধিপত্যবাদমুক্ত রাষ্ট্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। আমরা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতিকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখি না।
১১ দলীয় ঐক্যের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এখানে বিভিন্ন দলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বড় দল বা ছোট দল- এভাবে বিবেচনা না করে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করা হয়। শীর্ষনেতাদের বৈঠক থেকে লিয়াজোঁ কমিটির আলোচনা পর্যন্ত আমি অংশ নেয়ার চেষ্টা করি। আমার অভিজ্ঞতায়, এখানে মতামত দেয়ার সুযোগ রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলগুলোর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
অতীতের কিছু জোটে আলোচনা অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকত। ১১ দলীয় ঐক্যে আমরা তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি। এই ঐক্যের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গঠন।
নয়া দিগন্ত : আগামী পাঁচ বছরে জাগপা ও বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান? রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে আপনাদের অগ্রাধিকার কী হবে?
রাশেদ প্রধান : জাগপা এককভাবে ১৫১টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করবে- এমন বাস্তবতা আমি দাবি করছি না। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। আগামী দুই বছর বা পাঁচ বছর- যে সময়সীমাই ধরা হোক, আমাদের লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, দুর্নীতি কমানো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদেশী প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
আমি একটি পবিত্র বাংলাদেশের কথা বলি। পবিত্রতা বলতে শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ের পরিচ্ছন্নতা বোঝাই না; রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত করার কথাও বলি। একজন মানুষ উপাসনালয়ে গিয়ে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ঘরের বাইরে, রাস্তাঘাটে, বাজারে ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যদি অন্যায় ও দুর্নীতি থাকে, তাহলে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হয় না।
বাংলাদেশকে আমরা মাতৃভূমি হিসেবে দেখি। তাই এর প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সেবায় ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া আমাদের লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কাক্সিক্ষত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠা করা।
নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র সংস্কার জরুরি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের সঙ্কট নিরসনে এখন কী করা উচিত?
রাশেদ প্রধান : গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে সংসদীয় আলোচনার সুযোগ এখনো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। তবে সরকার যদি জনগণের রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয় এবং আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে রাজনৈতিক সঙ্কট আরো গভীর হবে।
আমরা নতুন করে এমন গণভোটের পক্ষে নই, যার মাধ্যমে আগের গণভোটের রায়কে পাশ কাটানো হয় বা দলীয় ভিন্নমতকে আবারো সামনে এনে প্রক্রিয়াটি জটিল করা হয়। জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটির ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের পথ তৈরি করতে হবে।
আমি মনে করি, সংসদে সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আমাদের লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের রায় প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








