বনের মুগ্ধতা ছড়ায় করমচা গাছের ফুল
বনের মুগ্ধতা ছড়ায় করমচা গাছের ফুল।

 রফিকুল হায়দার ফরহাদ

Advertisement

ভোলার চর ফ্যাশনের চর কুকরি মুকরির বন বিভাগের অফিস। মেঘনা নদীর মোহনায় কুকরি মুকরি বনকে বিভক্ত করা চর পাতিলা ডোশের (খাল) পাশেই বন বিভাগের দোতলা অফিস। সেই অফিসের নিচে দেখলাম শুকানো হচ্ছে কয়েক হাজার বীজ। একেকটি বীজ দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে এক ইঞ্চির মতো হবে। কিসের বীজ প্রশ্ন করতেই বন বিভাগের একজন জানালেন এগুলো কেজা গাছের বীজ। চর কুকরি মুকরির মানুষরা এই গাছকে কেজা গাছ বললেও আসলে এর নাম করমচা গাছ। ২০২৩ সালে প্রথমবার কুকরি মুকরিতে গিয়ে তখন এই বীজ নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে মনে মনে বন বিভাগের দায়িত্বশীলদের ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম। কারণ উপকূলীয় বনায়নে এভাবেই গাছের বীজ শুকিয়ে এরপর চারা করেন তারা। পরে তারা ট্রলারে করে এই চারা নিয়ে লাগায় নতুন জেগে ওঠা প্রত্যন্ত চর বা দ্বীপে। সেবার ওই চর পাতিলা ডোশে নৌকা নিয়ে চলার সময় মাঝি সেলিম আমাকে পূর্ণবয়স্ক কেজা বা করমচা গাছ দেখালেন।  তিনি অবশ্য নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই একে একে বিভিন্ন গাছের ওষুধি গুণ সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন।
গাঢ় সবুজ পাতার গাছ এই করমচা। তবে এই গাছের ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার জাহাজমারার চরে গিয়ে। গত বছর মে মাসে গিয়েছিলাম জাহাজমারার চরে। নয়া দিগন্তের স্থানীয় দুই প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম ও মাহমুদ হাসানকে নিয়ে সেখানে যাওয়া। জাহাজমারার চরের সমুদ্র সৈকতেই দেখলাম বেশ কয়েকটি করমচা গাছ। ফুল ফুটতে শুরু করেছে। ফুটন্ত ফুলের সৌন্দর্য আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তাই স্থানীয়দের গাছের নাম জিজ্ঞাসা করতেই তাদের উত্তর এটা করমচা গাছ। এর ফুল দেখতে শিম ও বরবটি ফুলের মতো। নীল ও সাদার সংমিশ্রণ। গাঢ় সবুজ পাতার মধ্যে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা ফুলগুলো দেখতে দুর্দান্ত লাগছিল। শিমের মতোই এক থোকায় অনেক ফুল ফোটে। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন কিছু ফুল ফুটেছে। আর কিছু কলির খোলসের ভেতর আবদ্ধ। কলিগুলো দেখতে ক্যাপসুলের মতো। গাছের ওপর তখন বইছিল সাগর পাড়ের প্রবল বাতাস। ঠিক মতো ফুলের ছবিই তোলা যাচ্ছিল না। ছবি তুলতে গেলেই বাতাসের ঝাপটায় সব এলোমেলো। শেষ পর্যন্ত কোনো মতে কয়েকটি ফুলের গোছা ক্যামেরা বন্দী করা। এই গাছের পাতাগুলো দেখতে অশ^থ গাছের পাতার মতো। তবে আকারে ছোট। 
বেশ শক্তপোক্ত গড়নের গাছ এই কেজা বা করমচা গাছ। তাই এই গাছ নৌকা বানানোর কাজে লাগে। এই করমচা গাছের কাঠের বিশেষত্ব আছে। এই কাঠ পানির নিচে ভালো থাকে। শুকনা অবস্থায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তাই উপকূলীয় জেলেরা নৌকার নিচের অংশ যা পানিতে ডুবে থাকে সেখানে ব্যবহার করে এই কাঠ। জানান, কুকরি মুকরির রাশেদ হাওলাদার ও মাঝি জাকির বক্স।
উপকূলীয় খাল ও নদীর ধারেই এই গাছ ভালো জন্মায়। এই গাছের চিকন শিকড় স্থানীয়রা মেসওয়াক হিসেবে ব্যবহার করে। জানান রাশেদ হাওলাদার। সে সাথে এই করমচা গাছের বীজ শুকিয়ে গুড়া করে খেলে অ্যালার্জি দূর হয়। সাথে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও চলে যায়। এই তথ্য দিলেন জাকির মাঝি। একটি করমচা ফলের ভেতর একটি বীজই থাকে। ফলটা দেখতে শিমের মতোই। ঠিক ছোট সাইজের এক বীজ ওয়ালা শিমের মতো।
নৌকার কাঠের কাজ ছাড়াও উপকূলীয় জনগণের জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্যও এই কাঠ ব্যবহৃত হয়। জানা গেছে এই গাছের বীজ বা ফল পানিতে সেদ্ধ করে তেল বের করা হয়। সেই তেল জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কুপি বা প্রদীপের জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করে উপকূলীয় এলাকার জনগণ। এই তেল খোস পাচড়ার লাগালে উপকার পাওয়া যায়। সংরক্ষিত ফসলে এই বীজ রাখলে তাতে পোকা ধরে না। কারণ এই ফল তিতা। তা ছাড়া এই ফুল থেকে মৌমাছি যে মধু সংগ্রহ করে তা স্বাদে কিছুটা তিতা। জানালেন স্থানীয়রা। এর তেলের গন্ধটা অস্বস্তিকর। এ ছাড়া সাবান তৈরিতে, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পিচ্ছিল জাতীয় পদার্থ (লুব্রিকেন্ট) তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এই করমচা গাছের তেল। চর্ম রোগের চিকিৎসা ছাড়াও যকৃতের রোগ নিরাময়েও এই তেল ব্যবহার করা হয়। আবার মাছ শিকারের বিষ হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এই করমচা গাছের তেল। কারণ এই তেলে আছে কারানজিন ও পঙ্গামল জাতীয় পদার্থ। এই তেলকে বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহারের জন্যও চলছে গবেষণা।
বর্ষার আগে এর ফুল ফোটা শুরু হলেও বসন্ত কালে এই করমচা ফল আঁটি থেকে পিটিয়ে বের করা হয়। প্রতিটি বীজের ওজন এক থেকে দুই গ্রাম। পাঁচ বছর বয়স থেকে এই গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়। একটি পরিপূর্ণ গাছ  ১০ কেজি থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত ফল দেয়।