
নিজস্ব প্রতিবেদক
সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে চরম দুর্নীতি, অনিয়ম ও নৈরাজ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসব করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে সঙ্কটের অভাব নেই; যেখানেই হাত দেবেন, সেখানেই সঙ্কট। সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও নাগরিকদের ওপর।
গতকাল রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সারা দেশে সারসঙ্কট এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মো: আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো: ইজ্জত উল্লাহ এমপি, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ড. রেজাউল করিম এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলো, একজনের দায়িত্ব থাকলেও কথা বলেন আরেকজন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর; কিন্তু কথা বলছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা চেপে বসেছে। জেলায় গঠিত কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনজনকে মনোনীত করা হয়েছে। এ কারণে যোগ্য ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ নেই। বিএনপির নেতারা টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন। ফলে সার বিতরণে সরকার শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কারণে দেশে সারসঙ্কট হচ্ছে। ডিলার নিয়োগে শর্ত মানা হয়নি। কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে তালিকা দেয়া হয়েছে এবং সেগুলো আমলে নিয়ে ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। টাকা নিয়ে ডিলার নিয়োগ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি আরো বলেন, ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপির ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় সারসঙ্কট হয়েছে এবং কৃষকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক জায়গার বাসিন্দাকে অন্য জায়গায় সারের ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। এমনকি কখনো সারের ব্যবসা না করেও অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন। এ ছাড়া একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ডিলারশিপ নিয়েছেন। ভুয়া গুদাম ও ভুয়া চুক্তিনামা দিয়েও ডিলারশিপ নেয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় চাপের মুখে ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এমনকি রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় বিএনপির প্যাডে দেয়া ডিলার নিয়োগের তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নামও পাওয়া গেছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ডিলারশিপ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সরকারের কোনো মন্ত্রীই নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না। ফলে এখন ‘সবার আগে বিএনপি’, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়। হাইকোর্টের আদেশ ভঙ্গ করে সব ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নমুক্ত একটি মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা; কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার তা বাস্তবায়ন করতে দেবে না। এ জন্য বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধন করে ফ্যাসিস্টদের মতো সারা জীবন ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী সরকারের সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করতে ব্যস্ত হয়েছে সরকার।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের অনুমোদিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে চাই আমরা; কিন্তু সরকার সেটিকে উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর আদলে আবারো সবকিছু সাজাচ্ছে। এ জন্য সরকার চায় না যে, বিরোধী দল সংবিধান সংস্কারে অংশগ্রহণ করুক। ইচ্ছাকৃতভাবে বিরোধী দলকে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে বাইরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অপকৌশল আড়াল করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। তাদের লক্ষ্য হলো আজীবন ক্ষমতায় থাকা, যা ফ্যাসিবাদী চিন্তার একটি সর্বনাশা পদক্ষেপ। আমরা এই সর্বনাশা চিন্তা থেকে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীকে ফেরানোর চেষ্টা করব। এই বিতর্ক রাজপথে ঠেলে না দিয়ে সংসদে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের ছয় দফা দাবি : সংবাদ সম্মেলনে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলো হলোÑ ১. সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৩. ডিলারশিপ পাইয়ে দেয়ার নামে অর্থ আদায়ের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সারসঙ্কট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
৫. ডিলার নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।
৬. কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। ভিত্তিহীন অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কাউকে দায়ী করা যাবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








