ডিসেম্বরে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তির ল্যমাত্রা সরকারের

আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬ মাসে ছয় কিস্তিতে ৪.৫০ বিলিয়ন ডলার ঋণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নিতে চায় বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংককে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল কার্কের সাথে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ শেষে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বার হতে পারে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, চলতি মাসের শেষে আইএমএফের স্টাফ মিশন বাংলাদেশ সফরের পর স্টাফ লেভেল অ্যাগ্রিমেন্টের সময় ঋণের পরিমাণ ও শর্ত চূড়ান্ত হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা : বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা  আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হবে। সেখানে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর উপায় এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও উল্লেখ থাকবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকেই ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেয়া শুরু হয়েছে। সঙ্কটাপন্ন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের নিয়মিতভাবে অর্থ ফেরতকার্যক্রম অব্যাহত রাখার মাধ্যমে তাদের আস্থা বাড়ানো হবে। এই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ আমলে স্বার করা ঋণচুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল, যা এখন বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নতুন ঋণচুক্তিতে খেলাপি ঋণের হার কতটা কমানো হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তায় : এদিকে ব্যাংককে এক সেমিনারে গতকাল আলোচনায় উঠে এসেছে যে, বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, স্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ, উচ্চ সরকারি ঋণ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কিভাবে মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত নেবে, নীতিনির্ধারণী কমিটিতে ভিন্নমত কিভাবে প্রতিফলিত হবে। সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা সাধারণ মানুষের কাছে কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবেÑ এসব প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক বাজারে আস্থা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো ও জনসংযোগ কৌশলকে এখন মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সুদের হার নির্ধারণ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব : সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা জানান, মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সরাসরি ও পরোভাবে যুক্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ বাড়ালে ব্যাংকঋণের ব্যয় বাড়তে পারে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং ভোক্তাদের ব্যয় করার প্রবণতা প্রভাবিত হতে পারে। অন্যদিকে, ঋণের চাহিদা ও সামগ্রিক ব্যয় কমে গেলে সময়ের সাথে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে সুদের হার বাড়ানোর ফল তাৎণিক নয়। অর্থনীতির কাঠামো, ব্যাংকগুলোর ঋণনীতির ধরন, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
সুদহার কমলে বিনিয়োগ বাড়বে : সেমিনারে অংশ নেয়া একজন বলেন, সুদের হার কমানো হলে ঋণ নেয়া ও বিনিয়োগ উৎসাহিত হতে পারে। কিন্তু উৎপাদন সমতা সীমিত থাকা, আমদানিনির্ভরতা বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘেœর মতো সমস্যা থাকলে শুধু সুদের হার কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা কঠিন হতে পারে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত পরিবর্তন কেন প্রয়োজন, তার সুফল পেতে কতটা সময় লাগতে পারে এবং কোন ঝুঁকিগুলো রয়ে গেছেÑ এসব বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা থাকলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা কমতে পারে।
উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনায় নিজস্ব অগ্রাধিকার : আইএমএফের ঋণসহায়তা পেতে বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ড. তিতুমীর আল মাহমুদ তিতুমীর  বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়গুলো এগিয়ে নেয়া হবে। সরকার প্রতিটি পদপে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, শুধু আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেও বাংলাদেশের সংস্কারকার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন কৌশল ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চলমান আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অগ্রগতি হবে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরা কর্মসূচি আরো কার্যকরভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

Advertisement