
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীতে নজরদারি বাড়িয়েছে ইরান। জাহাজ শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করতে নতুন সামরিক ইউনিট মোতায়েনের কথা জানিয়েছে দেশটির নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সম্প্রতি প্রণালীতে জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে সেপ্টেম্বরে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে যাওয়া তেল পরিবহন আবারো কমে গেছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির মঙ্গলবারের খবরে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুন ধরে যাওয়া একটি ট্যাংকার শনাক্তের পর হরমুজ প্রণালীর পূর্ব দিকে, ওমান সাগর ও আরব সাগরজুড়ে নতুন বিন্যাসে সামরিক ইউনিট মোতায়েন করেছে ইরানের নৌবাহিনী। এসব ইউনিট শত্রুপক্ষের তৎপরতা ও ওই অঞ্চলের জাহাজ চলাচলে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে। জাহাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ না করার পাশাপাশি নিরাপদে চলাচলের জন্য ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর সাথে সমন্বয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। রয়টার্সকে দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১০ দিন আগে থেকে ইরান তাদের বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারী বলে বিবেচিত জাহাজের বিরুদ্ধে হামলার কৌশল ও গতি পরিবর্তন করেছে। এক ইরানি কর্মকর্তার দাবি, হামলার ধরন পরিবর্তনের একটি উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা।
হরমুজে রেকর্ড হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার ঘটনা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রণালীতে ১০টি ট্যাংকারে হামলা হয়। এরপর ৫ অক্টোবর আরো একটি হামলার ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) ৬ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে আরো ১৫টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে গত চার দিনেই ঘটেছে ১১টি। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানায় একটি কনটেইনার জাহাজ ও একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার স্বার্থেই প্রণালীতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যৌথ মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) রোববারের প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকির মাত্রাকে ‘গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ড্রোন দিয়ে নজরদারি, জাহাজকে লক্ষ্য করে তৎপরতা এবং সামুদ্রিক বেতার যোগাযোগের মাধ্যমে জাহাজের সাথে যোগাযোগ ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
তেল পরিবহন কমেছে, বেড়েছে দাম
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান কার্যত প্রণালীটি বন্ধ করে দেয় এবং নিজেদের বিধিনিষেধ ভাঙার চেষ্টা করা জাহাজে হামলা জোরদার করে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেপ্টেম্বরে ইরানকে বাদ দিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার ৮১ শতাংশের বেশি পুনরুদ্ধার হয়েছিল। কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ওই মাসের ১৪ দিন বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রফতানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় আরো বেশি ট্যাংকার চলাচল শুরু করেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র ২৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা চলতি মাসের সর্বনিম্ন। এর মাত্র তিন দিন আগে ৮ অক্টোবর, এই পরিমাণ ছিল প্রায় দুই কোটি আট লাখ ব্যারেল। যুদ্ধের আগে দৈনিক গড় পরিবহন ছিল এক কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল। এ দিকে বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৬ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। মঙ্গলবার লেনদেন শেষে এর দাম ছিল ১০৫ দশমিক ৬৯ ডলার। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ছিল ৯৪ দশমিক ১৪ ডলার।
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার পর আইআরজিসি ছোট নৌকায় নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবহার করছে। এসব পর্যবেক্ষক মার্কিন যুদ্ধজাহাজসহ সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে আইআরজিসিকে তথ্য দিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। মার্কিন বাহিনী এমন একটি নৌযানের মুখোমুখি হয়ে আরোহীদের নৌযান ছেড়ে যেতে বলে এবং পরে সেটি ধ্বংস করে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে এবং সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হবে- আইআরজিসির এক কমান্ডারের এমন বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া বিবৃতিতে সেন্টকম দাবি করে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মার্কিন বাহিনী ও আঞ্চলিক অংশীদারদের হাতে। তাদের ভাষ্য, সোমবার উপসাগরীয় অংশীদারদের মাধ্যমে কৌশলগত জলপথটি দিয়ে এক কোটি ৯০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল পরিবহনে সহায়তা করেছে মার্কিন বাহিনী। এর আগে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সেন্টকম ছোট নৌযান ব্যবহার করে তেল বড় ট্যাংকারে স্থানান্তর করছে। তার দাবি, এই ব্যবস্থায় অংশ নেয়া পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। তিনি বলেন, প্রণালীটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোনের মতে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র- কোনো পক্ষের হাতেই নেই। ইরানের হামলা মূলত দেখানোর চেষ্টা যে ওয়াশিংটনও নৌপথটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তার মতে, পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মিত্রদেশগুলোর চাপ আরো বাড়তে পারে। ফেদারস্টোন আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় ইরান চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেয়া ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তাদের সাত শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে, তবে ওয়াশিংটনের জবাব অপর্যাপ্ত। সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সমঝোতা হবে না বলে জানিয়েছে ইরান।
আইআরজিসির চ্যালেঞ্জ
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে ইরান ‘অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে’ বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ-কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি ওজমায়েই। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত মনে করলে মার্কিন বাহিনীকে এর কাছাকাছি আসার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি। খবর তাসনিম নিউজের। সম্প্রতি টেলিভিশনে দেয়া নিজের প্রথম সাক্ষাৎকারে ওজমায়েই বলেন, আমেরিকানরা যদি মনে করে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত, তবে তারা যেন আরো কাছে আসে। আমরা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আইআরজিসির এই নৌ-কমান্ডারের দাবি, ১৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে আসার সাহস না পাওয়ায় জাহাজটি ওই এলাকা থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








