
- উপজেলা ও পৌরসভায় কমিটি গঠন
- গণসংযোগে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী বাছাই, ওয়ার্ডভিত্তিক প্রস্তুতি এবং স্থানীয় সমস্যার তথ্য সংগ্রহে কাজ করছে দলটি। পাশাপাশি সারা দেশে তরুণদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটির বর্তমান নেতৃত্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের পরিবর্তে এককভাবে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে এনসিপি। দলটির নেতারা বলছেন, সারা দেশে চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সারা দেশে তরুণদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হবে। যেখানে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাবে, তাদের সমর্থন দেয়া হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের পরাজিত করে সঠিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা। একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বারবার পেছানো হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যেও ভিন্নতা রয়েছে। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।
নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্ব হবে সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এনসিপি। ইতোমধ্যে দেশের ৫০০টি উপজেলার মধ্যে ২৭৬টি উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে তারা। দলটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঢাকা দুই মহানগর ছাড়া অন্য ১১টি মহানগরে মোট ৬১টি থানার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৪টিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে।
সারজিস আলম আরো বলেন, আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০০টি উপজেলাতেই এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি থাকবে। পাশাপাশি আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশের ৩৩০টি পৌরসভাতে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে গত ১১ অক্টোবর দলের রাজনৈতিক পর্ষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ২৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থানে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করা হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা, নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির প্রতিবাদে জনমত গড়ে তুলতে চায় দলটি। এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ৩০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের যৌথ উদ্যোগে শাহবাগে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্গাপূজায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে থাকার পরিকল্পনা করেছে দলটি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আরো ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভার প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার চেষ্টা করছে দলটি।
এ ছাড়াও গত দুই মাসে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারে জনসংযোগ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি, জ্বালানি সঙ্কট ও জনদুর্ভোগ নিয়ে সরকারের সমালোচনা, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদফতর ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছে তারা। ফলে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে জনমনে নিজেদের আস্থা তৈরিতে মাঠে সক্রিয় হয়েছে তারা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে প্রার্থী ঘোষণা
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। ঢাকা উত্তরে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম।
দলীয় কার্যালয়ে দুই সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দেয়া হয়। সভায় ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যা চিহ্নিত করা, সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী খোঁজা এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। দুই সিটিতে প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু করে এনসিপি। তবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করাই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নয়। ওয়ার্ড পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে পরিকল্পনা এবং ভোটারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগও নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ।
পাঁচ সিটিতে প্রার্থী চূড়ান্তের প্রস্তুতি
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ পাঁচ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছে এনসিপি। অন্য তিনটি সিটির মধ্যে কুমিল্লায় জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহীতে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো: মোবাশ্বের আলী এবং সিলেটে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালের নাম আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। ঢাকার দুই সিটিতে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় পর্যায়ে সমীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রার্থী বদলের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। শুরুতে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ এবং উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীবের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে উত্তর ও দক্ষিণে যথাক্রমে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়।
প্রার্থিতা সামনে রেখে দু’জনই ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণ থেকে ঢাকা উত্তরের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকায় এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর থেকে দক্ষিণের আওতাধীন এলাকায় ভোটার হন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় এই পরিবর্তনকে নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন তারা।
জোটের রাজনীতি, ভোটে আলাদা অবস্থান
এনসিপি ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের অংশ হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিকদের সাথে জোটবদ্ধভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জোটের প্রস্তুতি সভা ও এনসিপির রাজনৈতিক পরিষদের আলোচনার পর আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। দলটির নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দিলে নিজস্ব সাংগঠনিক পরিচয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই করা যাবে। তবে নির্বাচনে আলাদা অবস্থান নিলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে জোটের সাথে সমন্বয় রাখার কথা বলা হয়েছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সঙ্কট এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোটের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আলাদা হলেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহযোগিতা বজায় রাখতে চায় দলটি ।
এ বিষয়ে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, রাজনৈতিকভাবে ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে এগোবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে তারা আলাদাভাবে ভোট করবে। প্রচারে দেশে বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপির সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত, সারা দেশে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু মেয়র পদ নয়, ওয়ার্ড পর্যায়েও সক্রিয় কর্মী ও উপযুক্ত প্রার্থী প্রস্তুত করতে হবে। তৃতীয়ত, নাগরিক সমস্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
নির্বাচনের সময়সূচি, প্রার্থিতা ও প্রচার-সংক্রান্ত প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত সাংগঠনিক কার্যক্রমে রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির প্রস্তুতির ওপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাদের জন্য শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা নয়; বরং নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ। এখন দলটির সামনে প্রধান কাজ হলো ঘোষণাকে কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপ দেয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হাজির করা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








