কী বার্তা নিয়ে ফিরছেন ত্রিবেদী

 এস এম মিন্টু

Advertisement
  •  আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরানো
  •  প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর
  •  বাণিজ্য,  ট্রানজিট, সীমান্ত নিরাপত্তা ও পানি বণ্টন ইস্যু

 

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তিনদিন পর বাংলাদেশে ফিরছেন আজ। ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোসহ একাধিক সংবেদনশীল ইস্যুতে এক বিশেষ বার্তা নিয়ে তার এই ফেরাতে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক পাড়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। 
বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পর আইনি বিষয় এবং তার নিরাপত্তা বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়াও আদালতে কিভাবে বিচার কাজ চলবে তাকে কোন কারাগারে রাখা হবে সবমিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হওয়া কথা রয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণীদের সাথে। 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সাথে দিল্লির কৌশলগত ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যত রূপরেখা কেমন হবে এবং মোদি সরকার সম্পর্কের জট কাটাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে- সে সংক্রান্ত কূটনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবেই দীনেশ ত্রিবেদীর ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরা দেখা হচ্ছে। 
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান ও এরপর নির্বাচনে জিতে বিএনপি নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে, ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে আনার জাতীয় দাবি যখন জোরালো, ঠিক তখনই ভারতের নীতি-নির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।
গত মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সাথে বৈঠক করেছেন দীনেশ ত্রিবেদী। একই দিনে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সাথে তার ধারাবাহিক বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা নতুন বার্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মঙ্গলবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে বলা হয়, জেনারেল ধীরাজ শেঠের সাথে ত্রিবেদীর আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে বা কী বার্তা দেয়া হয়েছে, তা বিস্তারিত জানানো হয়নি। একই দিন নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক করেন ত্রিবেদী। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
এখানেই ত্রিবেদীর সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠকটি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়েও নয়াদিল্লি ঢাকার সাথে যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে- এমন ইঙ্গিত মিলছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানসহ নানা বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সাথে একই দিনে ত্রিবেদীর বৈঠককে ঢাকার সাথে যোগাযোগ ধরে রাখার একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মূলত তিনটি বড় বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। 
হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর চাপ: প্রথমত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলাসমূহের কারণে তাকে ফেরত চাওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক বার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার স্পষ্টভাবে দিল্লির কাছে উপস্থাপন করেছে। এই সংবেদনশীল ইস্যুতে ভারত সরকারের অবস্থান ও সম্ভাব্য আইনি-কূটনৈতিক পথনকশা নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার চেষ্টা হতে পারে।
তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রস্তুতি: দ্বিতীয়ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অ্যাজেন্ডা ও সময়সূচি নির্ধারণে ব্যাক-চ্যানেল আলোচনা এগিয়ে নেয়া।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে বাণিজ্য, ট্রানজিট, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যুতে সম্পর্কের গতি ফিরিয়ে আনা এবং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অনাস্থা নিরসন করা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই তার এই ঝটিকা সফর। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শীর্ষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করা, যাতে দুই দেশের মধ্যে ঝুলে থাকা দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভারতের জন্য এখন নির্দিষ্ট কোনো দলের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই; বরং জনগণের রায়প্রাপ্ত সরকারের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়াই দিল্লির একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
কূটনৈতিক সূত্রে জানানো হয়, দীনেশ ত্রিবেদীর এই সফরটি মূলত উচ্চপর্যায়ের ‘অনানুষ্ঠানিক কূটনীতি’ বা ট্র্যাক-টু রাজনীতির অংশ। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মনোভাব সরাসরি অনুধাবন করা এবং দিল্লির বার্তা পৌঁছে দেয়াই তার সফরের মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দীনেশ ত্রিবেদীর এই সফর থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী। তবে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি কতটা বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে তারেক রহমান সরকারের সাথে মোদি সরকারের কূটনৈতিক বন্ধুত্বের গভীরতা।
 এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফিরে আসার যে আলোচনা চলছে, বাস্তবে তার কোনো আলামত আমি এখনো দেখছি না। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন নয় যে তিনি সগর্বে দেশে ফিরবেন। যদি ফেরেনও, আইন অনুযায়ী সরকার তাকে কারাগারে পাঠাবে। তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, আইন তার নিজের পথেই চলবে। আমার মনে হয়, এসব আলোচনা বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমেই বেশি ছড়ানো হচ্ছে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের সামাজিক মাধ্যমে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে আমি মোটেই বিচলিত নই। দেশের পরিবেশ এমন অস্থিতিশীল হয়নি যে তাকে স্বাগত জানিয়ে আবার ক্ষমতায় বসানো হবে। এমন কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। কাঠামোবদ্ধ কোনো প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও এই মুহূর্তে আছে বলে আমি মনে করি না।
তিনি বলেন, গতকাল ডিবি প্রধান ও এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বলেছেন, আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং সব প্রস্তুতি রয়েছে, সেটি একটি স্বাভাবিক প্রস্তুতি। এর বাইরে অন্য কিছু দেখছি বলে আমার মনে হয় না।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত দুই দেশের সম্পর্ককে উন্নত করতে চায়, এমন বার্তা নিয়েই হয়তো তারা আসছে। প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠকের পর তাদের কাছ থেকে কোনো বার্তা আসা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশের প্রত্যাশাও অস্বাভাবিক নয়। সরকার পরিষ্কারভাবেই বলেছে, তাকে ফেরত দেয়া আমাদের অগ্রাধিকার। আমাদের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, আর অতীতে আমরাও চুক্তি অনুযায়ী ভারতের চাওয়া অনেক ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেছি। এই দাবি আইনগত এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের স্বাভাবিক চাওয়া। এই বিষয়ের সমাধান হলে পরবর্তী সব ক্ষেত্রে সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে আমি আশা করি। আমার মনে হয়, ভারতের উচিত তাকে ফেরত দেয়া। অন্যথায় তারা ভুল করবে, আর এই ভুলের মাশুল দুই দেশের জনগণকেই দিতে হবে।
গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে ফজলে এলাহী আকবর বলেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক নদী। ভারত আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেও বাংলাদেশ করেছে। বাংলাদেশের এই দাবি ন্যায্য। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালত বা সালিশের পথও খোলা আছে। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ সরকার ইতোমধ্যে এগিয়ে নিচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য পানির প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পানি না পেলে ব্যারাজ অকার্যকর হয়ে পড়বে। আমাদের ধৈর্য ধরে এগোতে হবে। বাংলাদেশ যদি ন্যায্য অবস্থানে অটল থাকে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে, আমরা অবশ্যই সফল হব।