মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১১ ভাগ : শিল্পঋণে ধাক্কা

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে, অন্য দিকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। এর সাথে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির নিষ্পত্তি কমে যাওয়া এবং শিল্পঋণের সাম্প্রতিক প্রবাহে দুর্বলতা অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের গতি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে- সে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ডববশষু ঝবষবপঃবফ ঊপড়হড়সরপ ওহফরপধঃড়ৎং-এ প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এলসি খোলার তুলনায় নিষ্পত্তির কাঠামোতে বেশ কিছু খাতে দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির নিষ্পত্তি কমেছে। বিপরীতে জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে। অর্থাৎ আমদানি চাহিদা পুরোপুরি সঙ্কুচিত হয়নি; বরং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের পরিবর্তে অর্থনীতির তাৎক্ষণিক ও চলতি চাহিদার দিকে আমদানির প্রবণতা বেশি রয়েছে।
মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১০.৬৮%
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ১৭৩.৮ মিলিয়ন ডলার এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬৩.৫ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী হিসাবে নিষ্পত্তির পরিমাণ ১৪৯.৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১০.৬৮ শতাংশ।
বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। কারখানা সম্প্রসারণ, নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সাধারণত এ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি প্রয়োজন হয়। ফলে এই খাতে এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়াকে বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।
তবে শুধু একটি সূচকের ভিত্তিতে বিনিয়োগ পুরোপুরি কমে গেছে- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু মূলধনী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি শিল্পঋণ ও এসএমই ঋণের কয়েকটি সূচকেও দুর্বলতা থাকায় বিষয়টি সামগ্রিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামালেও নিম্নমুখী প্রবণতা
শিল্প উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিল্পের কাঁচামাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৯৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের পর্যায়ের ২ দশমিক ০৮২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম।
এর অর্থ দাঁড়ায়, শিল্পের বিদ্যমান উৎপাদন কার্যক্রমেও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের চাহিদা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। এর পেছনে ব্যাংক ঋণের সীমিত প্রবাহ, উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা কিংবা বাজারের চাহিদা- একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। প্রদত্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে এসব কারণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
অন্য দিকে শিল্প খাতের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমলেও পেট্রোলিয়াম পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফলে আমদানি কাঠামোতে উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিবর্তে জ্বালানি ও অন্যান্য চলতি প্রয়োজনের ওজন বাড়ছে কি না, সেটিও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।
মোট এলসি প্রায় স্থির, কিন্তু ভেতরের চিত্র ভিন্ন
সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট সময়ে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ৬ দশমিক ১০৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৬ দশমিক ২৭৯৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ মোট হিসাবে পরিবর্তন সামান্য- প্রায় শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
কিন্তু মোট এলসি প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও খাতভিত্তিক চিত্র একেবারেই সমান নয়। ভোগ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালে নিষ্পত্তি কমেছে। অন্য দিকে পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য পণ্যে তা বেড়েছে।
এখানেই অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে- আমদানি কমেছে বা বেড়েছে- এমন সরল হিসাবের চেয়ে আমদানির ভেতরের গঠন এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যদি মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালের আমদানি দুর্বল হয়, তাহলে ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়ে গেলে তা বর্তমান উৎপাদন ও ভোগের চাহিদা ধরে রাখার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ব্যাক-টু-ব্যাক এলসিতেও চাপ
রফতানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির নিষ্পত্তিও কমেছে। প্রদত্ত তথ্যে এর পরিমাণ ৯৩৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার থেকে ৮১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে; কমেছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ।
বাংলাদেশের তৈরী পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদনে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতে নিষ্পত্তি কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, অর্ডারের প্রবাহ কিংবা আমদানিনির্ভর কাঁচামালের প্রয়োজন- এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার কারণ তৈরি করে।
তবে শুধু এলসি নিষ্পত্তির তথ্য দিয়ে রফতানি কমার নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
খেলাপি ঋণের বোঝা এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি পাওয়া যাচ্ছে শ্রেণিকৃত ঋণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত জুন ২০২৪-এর ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ, মার্চ ২০২৫-এ ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং জুন ২০২৫-এ ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশে ওঠে। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ তা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ডিসেম্বর ২০২৫-এ ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে আসে। তবে মার্চ ২০২৬-এ আবার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জুন ২০২৬-এ ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত প্রায় আড়াই গুণের কাছাকাছি বেড়েছে। জুন ২০২৪-এ যেখানে প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ১২ টাকা ৫৬ পয়সা শ্রেণিকৃত ছিল, জুন ২০২৬-এ তা প্রায় ৩৩ টাকা। এই চিত্র ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মান, ঋণগ্রহীতাদের সক্ষমতা এবং ব্যাংকের নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষমতা- তিন ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কৃষি ঋণে ইতিবাচক গতি
ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যেও কৃষি ও অকৃষি গ্রামীণ ঋণে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ খাতে বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আগের বছরের জুলাইয়ের ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকার তুলনায় এটি ২৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে ঋণ আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই ২০২৬-এ আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৫২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ হাজার ৯৫৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার তুলনায় ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি।
জুন ২০২৬ শেষে কৃষি ও অকৃষি গ্রামীণ ঋণের স্থিতি ছিল ৬৩ হাজার ৫৭৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ স্থিতি বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ পুরোপুরি থেমে নেই; বরং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়নে তুলনামূলকভাবে ভালো গতি দেখা যাচ্ছে।
এসএমই ঋণে মিশ্র চিত্র
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের চিত্রও একরৈখিক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এসএমই ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪৮ হাজার ১৪৪ কোটি ৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪৪ হাজার ২০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার চেয়ে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে বিতরণ বেড়ে ৭০ হাজার ১৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা হয়েছে। তবে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে তা নেমে এসেছে ৫২ হাজার ১০৭ কোটি ৭২ লাখ টাকায়।
অর্থাৎ এসএমই ঋণে সামগ্রিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও ত্রৈমাসিক প্রবাহে ওঠানামা রয়েছে। এই ওঠানামা ব্যবসায়িক আস্থা, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা এবং ঋণগ্রহীতাদের নতুন ঋণ নেয়ার আগ্রহের ওপর নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
শিল্প মেয়াদি ঋণে বড় সতর্ক সঙ্কেত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে শিল্প মেয়াদি ঋণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট শিল্প মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯৯ হাজার ৭৯৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার তুলনায় মাত্র ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
কিন্তু অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে বিতরণ হয়েছে ২০ হাজার ২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় এই প্রান্তিকে বিতরণ কমেছে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছে ২৪ হাজার ৫০৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ নতুন করে যত শিল্পঋণ বিতরণ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ঋণ আদায় হয়েছে।
ফলে শিল্পঋণের স্থিতি অবশ্য বেড়েছে- জুন ২০২৬-এ ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪২৬ কোটি ২ লাখ টাকা- কিন্তু নতুন ঋণ বিতরণের সাম্প্রতিক গতি শিল্প বিনিয়োগের জন্য খুব শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে না।
প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদত্ত পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এখানেই। অর্থনীতিতে একদিকে কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বাড়ছে, এসএমই ঋণের বার্ষিক প্রবাহও পুরোপুরি দুর্বল নয়; কিন্তু একই সাথে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমছে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমছে, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি কমছে এবং শিল্প মেয়াদি ঋণের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক বিতরণে বড় পতন ঘটেছে।
এর অর্থ অর্থনীতির উৎপাদনমুখী অংশে নতুন বিনিয়োগের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আর এর সাথে ব্যাংকিং খাতের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। কারণ ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ যদি খেলাপি ঋণে আটকে যায়, তাহলে নতুন ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমতে পারে। আবার ঋণপ্রবাহ কমলে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু স্বস্তি ফেরেনি
মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান অবশ্য কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২৬ সালের আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে।
আর ১২ মাসের গড় হিসাবে মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের আগস্টের ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু তা এখনো উচ্চপর্যায়ে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার গতি যতটা মানুষের স্বস্তি ফেরানোর জন্য প্রয়োজন, ততটা দ্রুত নয়।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্তে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং আগের সংশোধিত হিসাব ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৭ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি সূচকে দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে দ্রুত ফিরে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতির সামনে এখন তিনটি প্রশ্ন
সামগ্রিক উপাত্ত বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে।
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের বিপুল শ্রেণিকৃত ঋণ কিভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করে নতুন ঋণের জন্য ব্যাংকের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যাবে?
দ্বিতীয়ত, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পঋণের দুর্বলতার বিপরীতে কিভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকে আবার গতিশীল করা যাবে?
তৃতীয়ত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের খরচ কমিয়ে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কিভাবে বাড়ানো যাবে?
এই তিনটি প্রশ্নের সমাধান না হলে কৃষি ও গ্রামীণ ঋণের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি কিংবা সামগ্রিক এলসি প্রবাহের সামান্য বৃদ্ধি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর মতো অর্থায়নের গতি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমা, শিল্পের কাঁচামালের আমদানি হ্রাস এবং শিল্প মেয়াদি ঋণের সাম্প্রতিক বিতরণ কমে যাওয়ার সাথে ব্যাংকিং খাতের বিপুল শ্রেণিকৃত ঋণের 
যোগসূত্র তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি সতর্ক সঙ্কেত।