আমুসহ সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে চার্জ প্রস্তুত

 নিজস্ব প্রতিবেদক 

Advertisement

 

  •  চিফ প্রসিকিউটরের অনুমোদনের অপেক্ষা
  •  ইনুর সাজা বাড়াতে আপিল করবে প্রসিকিউশন
  •  জিয়াউলের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য মঙ্গলবার
  •  যাত্রাবাড়ীর ১৭ হত্যা মামলায় প্রতিবেদন ৮ নভেম্বর

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উপদেষ্টাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) প্রস্তুত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। দীর্ঘ তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে এসব অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন চিফ প্রসিকিউটরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।
তিনি বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন সাবেক এমপি ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও প্রস্তুত করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর বর্তমানে  ছুটিতে রয়েছেন। তিনি ফিরলে অথবা তার অনুমোদন পাওয়া গেলে শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হবে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) ফারুক খান, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক সংসদ সদস্য সোলাইমান সেলিম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য ও অন্যান্য উপকরণের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে।
ইনুর সাজা বাড়াতে আপিল
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করবে প্রসিকিউশন। চলতি সপ্তাহেই সাজা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে আপিল করা হবে।
রোববার প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম এ তথ্য জানান।
গত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সাথে মামলার দু’টি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। মামলায় তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন ট্রাইব্যুনাল এবং পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
জিয়াউলের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য মঙ্গলবার
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার অসম্পন্ন জবানবন্দী আগামীকাল মঙ্গলবার গ্রহণ করা হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার ১৫তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়া শুরু করেন। ওই দিন তিনি আংশিক জবানবন্দী দেন। তার বাকি জবানবন্দী ও পরবর্তী জেরার জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। 
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীমের দাবি, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ১৫ জন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দী ও জেরা শেষ হলে আসামিপক্ষ চাইলে সাফাই সাক্ষ্য দিতে পারবে। এরপর মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে যাবে।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলায় তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিনজনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে একই সময়কালে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ‘বনদস্যু দমন’-এর নামে মাসুদসহ আরো ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে ১৭ হত্যা : তদন্ত প্রতিবেদন ৮ নভেম্বর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো এক মাস সময় পেয়েছে প্রসিকিউশন। আগামী ৮ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে সময়ের আবেদন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি আরো এক মাস সময় চান। পরে ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম খান।
গৌরীপুরে ৩ হত্যা : অভিযোগ গঠন ২৮ অক্টোবর
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদের ছেলে তানজির আহমেদ রাজিবসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর এ বিষয়ে শুনানি হবে।
রোববার প্রসিকিউশনের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন দুই মামলায় গ্রেফতার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন তানজির আহমেদ রাজিব, গৌরীপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন চন্দ্র রায়, এ এস আই দেলোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা সানাউল, শাহাবুল আলম ও জোসেফ উদ্দিন জজ। অপর ছয় আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে গৌরীপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সোমনাথ সাহাও রয়েছেন।
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। কোথাও তদন্ত শেষ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি চলছে, কোথাও অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে, আবার কোনো কোনো মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্কের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রসিকিউশন বলছে, তদন্ত, সাক্ষ্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রতিটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।