
ইরানে কি সত্যিই পারমাণবিক হামলা চালাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এমন হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ফক্স নিউজের সাবেক উপস্থাপক টাকার কার্লসন। তাঁর দাবি, ইরানের মধ্যাঞ্চলে সন্দেহভাজন একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে ট্রাম্পের ওপর প্রতিদিন চাপ দিচ্ছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রোববার রাতে দীর্ঘ এক পোস্টে এসব দাবি করেন কার্লসন। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদুলু সোমবার (২ নভেম্বর) এ খবর জানিয়েছে। কার্লসন তার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ইরানের মধ্যাঞ্চলের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথা উল্লেখ করেছেন। ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ধারণা, সেখানে ইরান আবারো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। এই পাহাড়কে ফার্সিতে কুহে কালাং গাজ লা বা সংক্ষেপে কুহে কালাং বলা হয়। বাংলায় ক্লগ পাহাড় বলা যায়।
২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ফক্স নিউজে ‘টাকার কার্লসন টুনাইট’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন কার্লসন। এখন এক্সে নিজের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তিনি। তার দাবি, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো প্রায় ৩০০ ফুট পুরু কঠিন গ্রানাইট পাথরে ঢাকা। প্রচলিত মার্কিন অস্ত্র দিয়ে সেখানে আঘাত করা সম্ভব নয়। ফলে সামরিকভাবে হামলা চালানোর একমাত্র উপায় হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার। কার্লসন এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ‘বিবি (নেতানিয়াহু) এ বিষয়ে প্রতিদিন ট্রাম্পকে ফোন করেন।’
কার্লসনের দাবি, নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থেই তিনি ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে চাইছেন। সর্বশেষ নির্বাচনের পর ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন তাঁর। তা না হলে ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তদন্ত ও কারাদণ্ডের মুখেও পড়তে পারেন নেতানিয়াহু। এ জন্য তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবারো শুরুর চাপ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কার্লসন। তার দাবি, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফও নেতানিয়াহুর পথ অনুসরণ করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
কার্লসনের ভাষ্য, ইরানে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর নেতানিয়াহু গোপনে আবুধাবি সফর করে ইরানে চূড়ান্ত হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন চেয়েছিলেন। তবে আমিরাতের কর্মকর্তারা তাতে রাজি হননি। আট মাসের সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সার সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। শুধু অক্টোবরেই হরমুজ প্রণালীতে বিশ্বের প্রায় ৮৫০টি তেলবাহী সুপারট্যাংকারের মধ্যে ১১টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার দাবি।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে প্রায় ১০ কোটি মানুষের পানির সরবরাহ হুমকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন কার্লসন। তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক হামলা চালালে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারে উৎসাহিত হতে পারে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে পারমাণবিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এমনকি উত্তর কোরিয়া সিউলে হামলা চালাতে পারে। কার্লসন লিখেছেন, ‘প্রথম পারমাণবিক হামলার পর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য। সেই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং চূড়ান্ত।’ তার আরো অভিযোগ, ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন এনেছে, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী ছোট পারমাণবিক অস্ত্র প্রথমে ব্যবহারের সুযোগ সহজ হয়।
কূটনীতির পক্ষে ভ্যান্স ও উইটকফ
কার্লসনের দাবি, আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ট্রাম্প। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ তাকে তেহরানের সাথে কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। আলোচনা কঠিন হলেও ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের সাথে কথা বলা ব্যক্তিরা মনে করেন, নতুন করে সংঘাতে কারো লাভ নেই। তাই সমঝোতার চেষ্টা চালানো উচিত।
কার্লসনের এসব বক্তব্যের আগে শনিবার ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের আরো এক বা দুটি পারমাণবিক স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য লক্ষ্য। চাইলে ১০ মিনিটের মধ্যেই সেগুলোতে হামলা চালানো সম্ভব। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই স্থাপনাটির বিষয়েও ভাবতে পারেন। দ্রুতই সবকিছু করা সম্ভব।’ তবে পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দেয়ার কথা বলেননি তিনি। এর আগে ১৬ অক্টোবর নিউজম্যাক্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছিলেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে, অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, শনিবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত টেলিফোনে কথা হয়েছে। ইসরাইলি ও মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর পক্ষে নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসন মন্তব্য করে না। ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য ট্রাম্প সব বিকল্প খোলা রেখেছেন। রুবিওও জানিয়েছেন, ইরানে আবারো হামলা চালানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইরান অবশ্য পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনায় কোনো পারমাণবিক তৎপরতা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে সতর্ক করেছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








